Latest Post

ইমাম বোখারী (রঃ)
(৮১০-৮৭০খ্রিঃ)

যারা হাদিস শাস্ত্রে অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন, হাদিস সংগ্রহের উদ্দেশ্যে যারা শত শত মাইল দুর্গম পথ পদব্রজে গমন করেছিলেন, নির্ভুল হাদিস সমূহকে কষ্টিপাথরে যাচাই বাছাই করে গ্রন্থাকারে একত্র করার মত অসাধ্য কাজ সাধন করেছিলেন যারা, যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাধনার বিনিময়ে মুসলিম জাতি রাসূলুল্লাহ (সা:) এর নির্ভূল হাদিস সমূহ গ্রন্থাকারে পেয়ে সত্যের সন্ধান লাভ করতে পেরেছে ইমাম বোখারী(রঃ) তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য । হাদিস শাস্ত্রে তাঁর পান্ডিত্য ও সাধনার কারণে তিনি হাদিস শাস্ত্রে ‘বিশ্ব সম্রাট’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন । ইমাম বোখারী(রঃ) এর ডাক নাম ছিল আবু আবদুল্লাহ । তাঁর আসল এবং পূর্ণ নাম হল, আবু আবদুল্লাহ মোহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল ইবনে ইব্রাহীম ইবনে মুগীরা । তিনি ইমাম বোখারী নামেই সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন ।
১৯৪ হিজরীর ১৩ শাওয়াল মোতাবেক ৮১০ খ্রিস্টাব্দে শুক্রবার, জুমার নামাজের পর বর্তমান উজবিকিস্তানের বোখারা নামক শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর পিতার নাম ছিল ইসমাঈল । তিনিও হাদিস শাস্ত্রে পন্ডিত ছিলেন । ইমাম বোখারীর পূর্ব পুরুষগণ ছিলেন অগ্নিপূজক এবং পারস্যের অধিবাসী । পূর্ব পুরুষদের মধ্যে মুগীরা’ই প্রথম ইসলাম কবুল করেন এবং পারস্য হতে বর্তমান উজবিকিস্তানের বোখারা নামক শহরে এসে বসবাস শুরু করেন । এখানেই ইমাম বোখারী(রঃ) জন্ম লাভ করেন । বাল্যকালেই তাঁর পিতা মারা যান এবং মাতার নিকট লালিত পালিত হন । উল্লেখ্য যে, বাল্যাবস্থায়ই তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন; সে জন্যে মাতা নিজের এবং সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে খুব চিন্তিত থাকতেন এবং রাত দিন আল্লাহর দরবারে সন্তানের মঙ্গলের জন্যে দোয়া করতেন । একদিন মাতা আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে যখন ঘুমিয়ে পড়লেন; তখন মাতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে স্বপ্নে দেখলেন যে, তিনি যেন বলছেন, “হে পূণ্যবতী মহিলা, তোমার কান্নাকাটির দরুন আল্লাহ তোমার সন্তানের চক্ষু ভাল করে দিয়েছে ।” নিদ্রা ভঙ্গের পর তিনি দেখলেন ইমাম বোখারী (রঃ) এর চোখের অন্ধত্ব দূর হয়ে গেছে ।
ইমাম বোখারী(রঃ) এর স্মরণ শক্তি ছিল অসাধারণ । তিনি ১০ বছর বয়স পর্যন্ত বোখারার নিকটস্থ মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন । এরপর তিনি হাদিস শেখার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েন । ইমাম বোখারী (রঃ) এর বর্ণনা থেকে জানা যায়, হাদিস শিক্ষার জন্যে তিনি মক্কা, মদীনা, সিরিয়া, বসরা, মিসর, কুফা, বাগদাদ, আল জামিয়াত, হেজাজ, নিশাপুর, এবং দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্থানে হাদিসের শত শত সাক্ষাৎদাতার দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়িয়েছেন । তিনি এক হাজার ৮০ জন শায়খের নিকট হতে হাদিস সংগ্রহ করে তার সনদ ও মতনসহ মুখস্ত করেন । আল্লাহপাক তাঁকে অসাধারণ মেধা ও স্মরণ শক্তির দান করেছিলেন । মাত্র ১৮ বছর বয়সেই তিনি বিবিধ গ্রন্থ রচনায় ব্যাপৃত হন এবং হাদিসের জগদ্বিখ্যাত কিতাব ‘বোখারী শরীফ’ সব বহু গ্রন্থ রচনা করেন ।
‘বোখারী শরীফ’ এর আসল নামে প্রসিদ্ধ না হয়ে রচনাকারীর নামে প্রসিদ্ধ হয়েছে । ‘বোখারী শরীফ’ কিতাবের আসল নাম হচ্ছে, ‘আল জামেউছ ছহীহুল মুসনাদু’ । সংক্ষিপ্ত নাম ‘ছহীহে বোখারী অর্থাৎ ইমাম বোখারীর ছহীহ । সাধারণত সবাই একে ‘ছহীহ বোখরী’ বা ‘বোখারী শরীফ’ বলে । ছিহাহ ছিত্তার অন্যান্য কিতাবগুলোও অনুরূপভাবে রচনাকারীর নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে । ইমাম বোখারী (রঃ) তাঁর অন্যান্য সহপাঠীদের সাথে একদিন ওস্তাদ ইমাম ইসহাক ইবনে রাওয়াই(রঃ) এর নিকট হাদিস শুনছিলেন । ওস্তাদ বললেন,“হায়! কেউ যদি কেবলমাত্র ছহীহ হাদিসগুলোকে একত্রে সাজিয়ে লিপিবদ্ধ করে দিত ।” ইমাম বোখারী (রঃ) বর্ণনা করেন, এরপর একদিন আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমার সামনে আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) উপবিষ্ট । আমি হাতে পাখা নিয়ে তাঁর পবিত্র শরীর মোবারকে বাতাস করে মশা মাছি তাড়াচ্ছি । এরপর একজন স্বপ্নেও তা’বীর বর্ণনাকারীর নিকট স্বপ্নটি ব্যক্ত করলে তিনি আমাকে বললেন, “আপনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাদিস সমূহ হতে মিথ্যার জঞ্জালকে অপসারিত করবেন ।” ইমাম বোখারী(রঃ) বলেন, এরপর ছহীহ হাদিসের একটি কিতাব লেখার জন্যে আমার মনে প্রেরণা জাগে এবং ‘ছহীহ বোখারী’ লিপিবদ্ধ করি ।
ইমাম বোখারী(রঃ) মক্কা, মদীনা, বোখরা ও বসরায় বসে বোখারী শরীফ বিষয়ে প্রায় সবাই একমত যে তিনি মক্কায় হেরেম শরীফে বসে এ কিতাবের ভূমিকা লিপিবদ্ধ করেন । এছাড়া মদীনায় বিশ্বনবী (সাঃ) এর রওজা পাকের নিকটবর্তী স্থানে বসে অধিকাংশ হাদিস লিপিবদ্ধ করেছেন এবং কিতাবের পরিচ্ছেদসমূহ এখানে বসেই সাজিয়েছেন । অতঃপর মদীনার মসজিদে নববীতে বসে উহার চূড়ান্ত রূপ দান করেন । ইমাম বোখারী(রঃ) বোখারী শরীফ লিপিবদ্ধের ক্ষেত্রে এত সতর্কতা অবলম্বন করেছেন যে, প্রতিটি হাদিস লিপিবদ্ধ করার পূর্বে তিনি আল্লাহ প্রদত্ত স্বীয় ক্ষমতা, এলম ও অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রতিটি হাদিসের সনদ ও মতন কে সূক্ষ্মভাবে যাচাই বাছাই করেছেন এবং আল্লাহর সাহায্যে কামনা করেছেন । তিনি নিজেই লিখেছেন, “আমি এ কিতাবের প্রতিটি হাদিস এবং পরিচ্ছদ লেখার পূর্বে দু’রাকাত নফল নামাজ আদায় করেছি এবং দোয়া করেছি,“ হে আল্লাহ, তুমি মহাজ্ঞানী আর আমি মূর্খ । আমার হৃদয়ে জ্ঞানের আলো জ্বেলে দাও । আমি যেন হাদিস লিপিবদ্ধ করতেন । এভাবে তিনি সুদীর্ঘ ১৬ বছরে কঠোর পরিশ্রম করে তাঁর সংগৃহীত ও কন্ঠস্থ ছয় লক্ষের অধিক হাদিস থেকে বাছাই করে তাকরার সহ ৭৩৯৩ টি এবং তাকবার বাদে ২৭৬৯ টি হাদিস এ কিতাবে স্থান দেন । এ সকল কারণে পবিত্র কোরআনের পরই  বোখারী শরীফ নির্ভূল গ্রন্থের স্থান দখল করেছে এবং সমগ্র বিশ্বে এত জনপ্রিয়তা লাভ করেছে যে, শুধুমাত্র তাঁর নিকটই ৯০ হাজারেরও অধিক লোক এ কিতাবের হাদিস সমূহ শিক্ষা লাভ করেছেন । আজ মুসলিম বিশ্বের এমন কোন নেই যেখানে বোখারী শরীফ শিক্ষা দেয়া হয় না ।
ইমাম বোখারী (রঃ) পিতার নিকট থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রচুর ধন সম্পদ পেয়েছেন; কিন্তু তিনি তা নিজে ভোগ করেন নি । তিনি তাঁর প্রায় সমস্ত ধন সম্পদই শিক্ষার্থী, দরিদ্র ও অসহায় লোকদের মধ্যে বিতরণ করে দিয়েছিলেন । তিনি ভোগ বিলাস পচ্ছন্দ করতেন না । সাধারণ পোশাক ও সামান্য আহারেই তিনি সন্তুষ্ট থাকতেন । তিনি দৃঢ় ভাবে মনে করতেন যে, অতিরিক্ত ভোগ বিলাস মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি তাকওয়া (ভয়) কমিয়ে দেয় । তিনি যদি ভোগ বিলাস ও আরাম আয়েশে কাটাতেন তাহলে হাদিস শাস্ত্রে ও অসাধ্য সাধন করতে পারতেন কিনা সন্দেহ । ইমাম বোখারী(রঃ) এর অক্লান্ত পরিশ্রম, সাধনা ও অবদানের কারণেই মুসলিম জাতি আজ বোখারী শরীফের মত একটি বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ পেয়ে সত্যের সন্ধান লাভ করেছে । কথিত আছে, তিনি একাধারে ৪০ বৎসর পর্যন্ত রুটির সাথে কোন তরকারি ব্যবস্থার করেননি । কোন কোন দিন তিনি মাত্র ৩/৪ টি বাদাম বা খেজুর খেয়ে দিন কাটিয়েছেন । এমন কি হাদিস চর্চায় ও গবেষণায় তিনি এতই নিবৃত্ত থাকতেন যে, কোন কোন দিন খাওয়ার কথাই ভুলে যেতেন । হাদিস শাস্ত্রে অগাধ পান্ডিত্যের কারণেই তিনি হাদিস শাস্ত্রে ‘বিশ্ব সম্রাট’ উপাধিতে ভূষিত হন । ইমাম বোখারী(রঃ) এর জনৈক ছাত্র বর্ণনা করেছেন, “আমি একদা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে স্বপ্নে দেখলাম । তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথায় যাচ্ছ ? উত্তরে বললাম, ইমাম বোখারীর নিকট যাচ্ছি । রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, তাঁকে আমার ছালাম দিও ।” প্রিয় পাঠক, বিশ্বনবী (সাঃ) যার নিকট ছালাম পৌছান তাঁর মর্যাদা যে কত উর্দ্ধে হতে পারে তা সহজেই বোধগম্য ।
ইমাম বোখারী (রঃ) এর বয়স যখন ৫৫ বছর তখন তিনি নিশাপুরে ছিলেন এবং সেখানে তিনি হাদিস শিক্ষা দান করতেন । ইমাম বোখারী(রঃ) এর নাম যখন সমগ্র মুসলিম জাহানে ছড়িয়ে পড়ে তখন নিশাপুরের এক শ্রেণীর লোক ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে । এতে তিনি নিশাপুর ত্যাগ করে মাতৃভূমি বোখারায় চলে আসেন এবং লোকদের হাদিস শিক্ষাদানে ব্যস্ত হয়ে পড়েন । পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায়, এ ধরা পৃষ্ঠে যুগে যুগে যত মনীষীর আগমন ঘটেছে তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই তৎকালীন জালেম সরকার ও স্বজাতি কর্তৃক নিপীড়িত ও নির্যাতিত হয়েছেন । তাঁরা হাজারো লাঞ্চনা-গঞ্জনার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছেন । এমন কি মাতৃভূমি ও নিজ বংশের লোকেরাও তাঁদেরকে যথাযোগ্য সম্মান দেয়নি । বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) নিজ বংশ কুরাইশদের বিরোধিতা ও অত্যাচারের কারণেই নিজ মাতৃভূমি মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছিলেন । হাদিস শাস্ত্রের ‘বিশ্ব সম্রাট’ ইমাম বোখারী(রঃ) ও তৎকালীন জালেম সরকারের ষড়যন্ত্র ও রোষানলে পতিত হয়েছিলেন ।
ইমাম বোখারী (রঃ) নিজ মাতৃভূমি বোখারার জনগণের নিকট যথেষ্ট সম্মান পেলেও তৎকালীন জালেম সরকার তাঁকে মাতৃভূমিতে থাকতে দেয়নি । তিনি দেশ থেকে বিতাড়িত হলেন । ইমাম বোখারী (রঃ) ও তাঁর রচিত ‘সহী বোখারী’ এর সুনাম যখন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল তখন বোখারার তৎকালীন শাসনকর্তা খালেদ বিন আহমদ ইমাম বোখারী(রঃ) এর নিকট এ বলে সংবাদ পাঠালেন যে, তিনি এবং তাঁর সন্তানদের ‘আল জামেউছ ছহীহ’ অর্থাৎ সহী বোখারী অধ্যয়ন করতে ইচ্ছুক । কিন্তু তাঁরা অন্যদের সাথে ইমাম বোখারীর নিকট তা অধ্যয়ন করতে রাজি নন । কাজেই ইমাম বোখারী যেন শাসনকর্তার এ সংবাদ শুনে ইমাম বোখারী(রঃ) পরিষ্কার ভাবে দিলে “ লক্ষ লক্ষ গরীব শিক্ষার্থীদের উপেক্ষা করে আমি হাদিসে রাসূলকে বেইজ্জত করতে পারি না । এ এলম ধনী-গরীব, রাজা-প্রজা সকলের জন্যেই সমান । আমি হাদিসে রাসূলকে রাজা-বাদশাদের দরওয়াজার প্রত্যাশী বানাতে পারি না । যদি কারোর এ এলম হাসিল করার প্রকৃতই ইচ্ছে থাকে তাহলে তিনি যেন এখানে এসে তা শিক্ষা লাভ করে যান। আর যদি তিনি আমার এব্যবস্থা অবলম্বনে অসন্তুষ্ট হন তাহলে আমার কিছুই করার নেই ।”
শাসনকর্তা খালেদ বিন আহমদ ইমাম বোখারী(রঃ) এর উত্তর শুনে অসন্তুষ্ট হন এবং সম্পূর্ণ অন্যায় ও ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে তাঁকে মাতৃভূমি বোখারা ত্যাগ করার নির্দেশ দেন । ইমাম বোখারী(রঃ) বোখারা ছেড়ে প্রথমে ‘বাইকান্দ’ ও ‘সমরকান্দ’ এর উদ্দেশ্যে রওনা দেন । সমরকন্দ এর নিকটবর্তী ‘খরতঙ্গ’ নামক গ্রামে গিয়ে জানতে পারলেন যে, ‘সমরকন্দ’ এর অধিবাসীগণ বিপদাশঙ্কায় ইমাম বোখারীকে সেখানে আশ্রয় দিতে রাজি নয় । এ সংবাদ শুনে ইমাম বোখারী(রঃ) অত্যন্ত দুঃখিত হন এবং তাহাজ্জুদ নামাজের পর এ বলে দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ, এ বিশাল পৃথিবী আমার জন্যে সংকীর্ণ হয়ে উঠেছে । তুমি আমাকে তোমার দরবারে উঠিয়ে নাও ।” আল্লাহ পাক তাঁর দোয়া কবুল করলেন এবং এর কয়েক দিনের মধ্যেই ২৫৭ হিজরী মোতাবেক ৮৭০ খ্রিস্টাব্দের ঈদুল ফিতরের রজনীতে হাদিস শাস্ত্রের এ মহান পন্ডিত পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে চলে যান ।
তাঁর মৃত্যুর সংবাদ চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে মানুষ শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে । ঈদের দিন জোহর নামাযের পর তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং হাজার হাজার লোক তাঁর জানাজায় শরীক হয় । সমরকন্দের অন্তর্গত ‘খরতঙ্গ’ নামক গ্রামে তাঁর সমাধি রয়েছে । ‘খরতঙ্গ’ গ্রামের অধিবাসী গালেব ইবনে জিব্রিল বর্ণনা করেছেন, “ইমাম বোখারী(রঃ) কে কবরের মধ্যে রাখা মাত্রই কবরের চতুস্পার্শে এত সুঘ্রাণ ছড়াতে লাগল যে, বিভিন্ন দেশের লোকজন কবর জিয়ারতের জন্যে এসে তথাকার মাটি নিতে আরম্ভ করল । অবশেষে আমরা ঐ কবরকে বেষ্টনী দ্বারা রক্ষা করতে বাধ্য হলাম । ঐ সুঘ্রাণ দীর্ঘদিন স্থায়ী ছিল ।
ইমাম বোখারী(রঃ) আজ আর নেই; কিন্তু হাদিস শাস্ত্রে তিনি যে সুবিশাল গ্রন্থ ‘সহী বোখারী শরীফ’ লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন তাতে মুসলিম বিশ্বে তিনি চির অমর হয়ে আছেন ।

আব্রাহাম লিঙ্কন
(১৮০৯-১৮৬৫)

আব্রাহাম লিঙ্কন শুধু আমেরিকার নন, পৃথিবীর ইতিহাসের যে কয়জন মানবতাবাদী গণতন্ত্রপ্রেমী মহান রাষ্ট্রনায়ক জন্মগ্রহণ করেছেন, তিনি তাদের অন্যতম । লিঙ্কনের জন্ম হয় আমেরিকার কেন্টাকি প্রদেশের একটি ছোট গ্রামে । লিঙ্কনের বাবা টমাস লিঙ্কন ছিলেন ছুতোর মিস্ত্রি । লেখাপড়া কিছুই জানতেন না । অতি কষ্টে দীনদরিদ্রের মত তিনি সংসার চালাতেন ।
লিঙ্কনের যখন চার বছর বয়েস, তাঁর বাবা ইন্ডিয়ানা প্রদেশের অরণ্যময় অঞ্চলে গিয়ে পাকাপাকিভাবে বসবাস করবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন । বাড়ির চারদিকে জন্তু-জানোয়ার-এর হাত থেকে বাচবার জন্য বড় বড় খুটি পোতা থাকত । কাঠের কাজ আর শিকার করেই লিঙ্কনের বাবা সংসার চালাতেন ।
এই কঠিন প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে বসবাস করতে করতে লিঙ্কন হয়ে ওঠেন পরিশ্রমী সাহসী । লিঙ্কনের তখন ছয় বছর বয়েস । হঠাৎ তাঁর মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন । তখন সেখানে কোন চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না । এক গ্রাম্য ডাক্তার থাকতেন পঁয়ত্রিশ মাইল দূরে । প্রায় বিনা চিকিৎসাতেই সাত দিন পর মারা গেলেন লিঙ্কনের মা ।
মা মারা যাওয়ার পর একটি বছর অতিক্রান্ত হল । লিঙ্কনের বাবার পূর্বপরিচিত এই মহিলার কিছুদিন আগে স্বামী মারা গিয়েছিল । সংসারে একজন মহিলার প্রয়োজন বিবেচনা করেই তাকে বিয়ে করে নিয়ে এলেন টমাস। লিঙ্কন দেশের সমস্ত মানুষের কাছে আহ্বান জানালেন যুদ্ধে যোগ দেবার জন্য । তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সৈন্যদলে নাম লেখাল চল্লিশ বছরের এক প্রাক্তন ক্যাপ্টেন, নাম গ্র্যান্ট । গ্র্যান্ট সৈনিক হিসাবে ছিলেন খুব বীর সাহসী । কিন্তু তার প্রধাণ দোষ ছিল অত্যধিক পরিমাণে মদ্যপান করতেন আর এই দোষেই তার চাকরি গিয়েছিল ।
শেষ পর্যন্ত গ্র্যান্টের প্রচন্ড আক্রমনের মুখে পিছু হঠতে আরম্ভ করলেন লী । দক্ষিণের একটার পর একটা শহর তার হাতছাড়া হয়ে গেল । শেষে লী আশ্রয় নিলেন রীচমন্ড শহরে । শহরের উপকন্ঠে তখন গ্র্যান্টের কামান গর্জন  করছে । এখন শুধু অপেক্ষা লীর আত্মসমর্পণের ।
দেশবাসীর কাছে লিঙ্কন তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন । তিনি বললেন,“কারোর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ না করে সকলের প্রতি উদার মনোভাব নিয়ে… আসুন আমরা সকলে মিলে আবদ্ধ কাজগুলি শেষ করি । জাতির ক্ষত আরোগ্য করা, এই যুদ্ধের গুরুভার যিনি বহন করেছেন তাকে অথবা তার বিধবা পত্নী ও পিতৃহীন সন্তানদের পালন করা, নিজেদের মধ্যে ও সকল জাতির সঙ্গে ন্যায্য এবং স্থায়ী শান্ত অর্জন ও পোষণের ব্যবস্থা- এই আমাদের কর্তব্য ।” অবশেষে দীর্ঘ পাঁচ বছর পর যুদ্ধ শেষ হল । লী আত্মসমর্পণ করলেন ।
ওয়াশিংটনে ফিরে এলেন লিঙ্কন । শত শত মানুষের অভিনন্দনের জোয়ারে বেসে গেলেন তিনি । জনগণের ভিড় কমতেই একে একে মন্ত্রীপরিষদের সদস্যরা এসে ভিড় করে সেখানে । এখনো কত কাজ বাকি । রাতের বেলায় থিয়েটারে যাবার কথা । অনেকটা মেরির অনুরোধেই তিনি রাজি হলেন ।
থিয়েটার হলে পৌঁছতেই সমস্ত দর্শকরা তাকে অভিনন্দন জানাল । নিজের আসনে গিয়ে বসলেন, লিঙ্কন আর মেরি । দুঘন্টা কেটে গিয়েছে, বক্সের দরজার সামনে যে প্রহরী ছিল, তার কাছে একজন লোক এসে বলল, প্রেসিডেন্টকে একটা সংবাদ দিতে হবে । রক্ষী ভেতরে যাবার অনুমতি দিতেই আততায়ী ভেতরে ঢুকেই লিঙ্কনের মাথা লক্ষ্য করে গুলি চালাল । চেয়ারের উপর লুটিয়ে পড়লেন লিঙ্কন । লিঙ্কনকে ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়া হল থিয়েটার হলেন সামনের একটা বাড়িতে । আঘাতের বিরুদ্ধে তাঁর বলিষ্ঠ দেহের প্রাণসত্তার দ্বন্দ্ব চলল নয় ঘন্টা ধরে । লিঙ্কন অচেতন, সেখানে উপস্থিত মেরি, লিঙ্কনের বড় ছেলে, তাঁর মন্ত্রীপরিষদের সবাই । সকাল সাতটায় অজ্ঞান অবস্থায় লিঙ্কন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ।
মৃত্যুর সময় লিঙ্কনের বয়স হয়েছিল ছাপান্ন । এই জীবনের মধ্যেই তিনি যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অখন্ডতা এবং মানুষের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখবার জন্য সংগ্রাম করেছেন তাই নয়, তিনি তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে মানুষের মর্যাদার দিগন্তকে প্রসারিত করেছেন । তাঁর জীবনকে উৎসর্গ করেছেন এক সার্বজনীন আদর্শের জন্য-জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা, জনগণের শাসন, যা কখনো পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হবে না ।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি
(১৪৫২-১৫১৯)

মানব সভ্যতার ইতিহাসে যদি পূর্ণ হিসাবে কারো নাম বিবেচনা করতে হয়, তার একটি নাম উচ্চারন করতে হয়, তিনি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি । এমন বহু বিচিত্র প্রতিভার সম্মেলন সম্ভবত অন্য কোন মানুষের মধ্যেই দেখা যায়নি ।
তিনি চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, অঙ্কশাস্ত্রবিদ, গায়ক, প্রকৃতিবিজ্ঞানী, শরীরতত্ত্ববিদ, সামরিক বিশেষজ্ঞ, আবিষ্কারক, স্টেজ ডিজাইনার দার্শনিক ।
প্রতিটি বিষয়েই তিনি চেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে এবং অনেকাংশে তিনি সফল ও হয়েছিলেন । এ যেমন একদিকে তাঁর জীবনের গৌরব, অন্যদিকে ব্যর্থতা । তিনি মানবীয় সীমায়িত শক্তি নিয়ে চেয়েছিলেন ইশ্বরের মত সীমাহীন হতে । তাই সাফল্যের চূড়ায় উঠেও কখনো তৃপ্তি অনুভব করেননি । মনে হয়েছে তাঁর জীবন এক অসমাপ্ত যাত্রাপথ । যে পথের শেষ তাঁর কাছে অগম্যই রয়ে গেল ।
ইতালির রেনেসাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ দ্য ভিঞ্চি বিধাতার পরিহাসে এক কুমারী নারীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন । (১৪৫২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম) তাঁর বাবার নাম ছিল পিয়েরো এ্যান্টানিও দ্য ভিঞ্চি । পিয়েরো ছিলেন উকিল ।
শৈশব থেকেই তাঁর প্রতিভা বিকশিত হয়ে উঠেছিল । তাঁর জীবীকার লিখেছেন, অঙ্কে তাঁর এত মেধা ছিল যে শিক্ষকরা তাঁকে পড়াত, তারা মাঝে মাঝেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ত । লিওনার্দোর অনুসন্ধিৎসা ছিল প্রবল । তাঁর জিজ্ঞাসায় বিরক্ত হয়ে উঠত শিক্ষকরা । অঙ্ক ছাড়াও সঙ্গীতের প্রতি ছিল তাঁর গভীর আকর্ষণ । বাঁশি বাজাতেন তিনি । পরবর্তীকালে যখন তিনি বাঁশি বাজাতেন, এক স্বর্গীয় সুষমায় ভরে উঠত সমস্ত পরিমন্ডলে । তাঁর কন্ঠস্বরও ছিল সুমিষ্ট । তাঁর গান শুনে সকলেই মুগ্ধ হত । সে যুগে চিত্রশিল্পকে কোন সম্মানীয় হিসেবে গণ্য করা হত না । তাই লিওনার্দো যখন ছবি আঁকা সম্ভব নয় তাই একটি বুদ্ধি করলেন । একটা বড় কাঠের পাটাতনের উপর গুহায় ছবি আঁকলেন। গুহার মধ্যে আধো আলো আধো ছায়ার এক অপার্থিব পরিবেশ । তার সামনে এক ভয়ঙ্কর ড্রাগনের ছবি, তার মাথায় শিং । চোখ দুটো আগুনের মত জ্বলছে । ভয়ংকর হিংস্র দাঁতগুলো যেন ছুরির ফলা, নাক দিয়ে বেরিয়ে আসছে আগুনের লেলিহান শিখা ।

ছবি আঁকা শেষ হতেই ঘরের মধ্যে ছবিটাকে রেখে জানালা বন্ধ করে দিলেন । পিয়েরো কিছুই জানেন না । ঘরে ঢোকামাত্রই সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে আতঙ্কে চিৎকার করে বেরিয়ে এলেন । পিয়েরো শাস্ত হতেই লিওনার্দো গম্ভীর গলায় বললেন, আমি মনে হয় আমার যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পেরেছি ।
এইবার আর ছেলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করলেন না পিয়েরো । তিনি ছবি আঁকবার অনুমতি দিলেন । সেই সময়ে ফ্লোরেন্সের  সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী ছিলেন ভেরক্লিয়ো । চিত্রশিক্ষার জন্যে তার স্কুলে গেলেন লিওনার্দো । তখন তাঁর বয়স আঠারো ।
লিওনার্দো শুধু ভেরক্লিয়োর কাছে ছবির আঙ্কিক শিক্ষা করেননি, তিনি দু চোখ মেলে দেখতে শিখেছিলেন প্রকৃতির অপরূপ রূপলাবণ্য, তার নিসর্গ শোভা,দেখেছেন নদীস্রোতের মধ্যে জীবনের প্রবাহ । তার সুখ,দুঃখ, ব্যথা-বেদনা শ্রদ্ধার গভীরে দেখেছেন নারীকে । ভেরক্লিয়োর কাছেই লিওনার্দো শিখেছিলেন কেমন করে মানব জীবনের গভীরে ডুব দিয়ে তার অপার রহস্যময়তাকে ফুটিয়ে তুলতে হয় রঙের তুলিতে । এই কারণেই লিওনার্দো ভেরক্লিয়োকেই তাঁর গুরু হিসাবে স্বীকার করেছেন । দু’বছর শিক্ষানবীশ শেষ করে লিওনার্দো স্থির করলেন নিজেই স্বাধীনভাবে শিল্পচর্চা করবেন । ফ্লোরেন্সে শিল্পীদের একটি সঙ্ঘ ছিল । তিনি তাতে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করলেন ।
ছবির পাশাপাশি চলছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার অধ্যয়ন । প্রকৃতপক্ষে তাঁর মধ্যে ঘটেছিল বিজ্ঞানী আর শিল্পীর এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ । তাঁর চিন্তা কল্পনা অভিজ্ঞতার বিস্তৃত বিবরণ লিখে রাখতেন খাতার পাতায় । দেখতে দেখতে দশ বছর ফ্লোরেন্সে কাটিয়ে দিলেন লিওনার্দো । এই সময় তিনি এঁকেছেন বেশ কিছু ছবি – এ্যানোনসেশন, মেরি ও যীশুর দুখানি ছবি, এক রমণীয় প্রতিকৃতি ।
ফ্লোরেন্সে থাকাকালীন সময়ে লিওনার্দো যে সমস্ত ছবি এঁকেছেন, তাঁর অধিকাংশই ছিল প্রচলিত শিল্পীরীতির থেকে স্বতন্ত্র । তার এক শিল্পীর স্টুডিওর চার-দেওয়ালের মধ্যে বসেই সব ছবি আকতেন । লিওনার্দোই প্রথম শিল্পী যিনি প্রকৃতির ছবি আঁকবার জন্য প্রিকৃতির কাছে যেতেন। যা প্রত্যক্ষ করতেন তাকেই মানে রঙে রাঙিয়ে রূপ দিতেন । ছবির মধ্যে তিনিই প্রথম শেডের ব্যবহার আরম্ভ করেন ।
লিওনার্দো স্থির করলেন, তিনি মিলানে যাবেন । মিলানের অধিপতি ছিলেন লুডোভিকো । ১৪৮২ সালে লিওনার্দো মিলানো এলেন। সেই সময় ফ্লোরেন্সের ডিউকের প্রাসাদে এক সঙ্গীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল । সেখানে লিওনার্দো তাঁর বাঁশি বাজালেন । তাঁর অসাধারণ সঙ্গীত প্রতিভায় মুগ্ধ হলেন ডিউক । তাকে নিজের প্রাসাদে আমন্ত্রণ করলেন । কয়েকদিনের পরিচয়েই ডিউক উপলব্ধি করতে পারলেন কি অসাধারণ প্রতিভাধর পুরুষ এই লিওনার্দো ! তিনিই তাকে মিলানের অধিপতি লুডোভিকোর কাছে পত্র লিখতে অনুরোধ করলেন । লিওনার্দো লিখলেন তাঁর সেই বিখ্যাত পত্র । এতে তিনি লিখলেন সামরিক প্রয়োজন ৯ টি মৌলিক সম্পূর্ণ নতুন আবিষ্কারের কথা ।
মিলানোর অধিপতি আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসলেন লিওনার্দোকে । প্রথম সাক্ষাতেই মুগ্ধ হলেন লুডোভিকো । লিওনার্দোকে নিজের রাজদরবারের অন্যতম প্রধান সভাসদ করে নিলেন । রাজপ্রাসাদেই তাঁর থাকার আয়োজন করা হল ।
শুরু হল লিওনার্দোর জীবনের আরেক অধ্যায় । দীর্ঘ আঠারো বছর লিওনার্দো ছিলেন মিলানে । উদার হৃদয় লুডোভিকোর সাহচর্যে এখানেই তাঁর প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল ।
বহুদিন ধরেই লিওনার্দো কল্পনা করতেন এক আদর্শ শহরের । যে শহর হবে সর্বাঙ্গ সুন্দর, যেখানে মানুষের প্রয়োজনীয় সমস্ত সুযোগ-সুবিধা থাকবে । তিনি দুদিকে বিভক্ত । একদিকে মানুষ,যানবাহন যাবে, অন্যদিকে আসবে । শহর হবে ছোট । তাতে ৫০০০-এর বেশি বাড়ি থাকবে না । ছোট ছোট শহর রক্ষণাবেক্ষণ করা সহজ । শহর বড় হলে লোকসংখ্যা বাড়বে । তখন দেখা দেবে নানান সমস্যা । তাছাড়া শহরের সামর্থ্যের তুলনায় মানুষের সংখ্যা বেশি হলে তা হবে খোঁয়াড়ের মত । অস্বাস্থ্যকর অসুবিধাজনক । শহরের কোন নর্দমাই বাইরে হবে না । প্রতিটি নর্দমা হবে মাটির নিচে । সেখান দিয়ে শহরের সব আবর্জনা শহরের বাইরে নদীতে গিয়ে পড়বে । লিওনার্দোর এই আদর্শ শহরের পরিকল্পনা সর্বযুগে সর্বকালেই প্রযোজ্য । কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও লুডোভিকো লিওনার্দোর এই পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন নি ।
শুরু হল লিওনার্দোর ভাবনা । কি ছবি আঁকবেন ? দীর্ঘ ভাবনার পর স্থির করলেন যীশুর শেষ ভোজের ছবি আঁকবেন – The last supper । চিত্রশিল্পের জগতে লাস্ট সাপার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ছবি । “যীশু তার বারোজন শিষ্যকে নিয়ে শেষ ভোজে বসেছেন । তাঁর দুপাশে ছয়জন ছয়জন করে শিষ্য । সামনে প্রশস্ত টেবিল । পেছনে জানালা দিয়ে মৃদু আলো এসে পড়েছে । যীশু বলেছেন তোমাদের মধ্যে কেউ একজন বিশ্বাসঘাতকতা করে আমাকে ধরিয়ে দেবে । শিষ্যরা চঞ্চল হয়ে উঠেছে । তারা সকলে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে তাদের মধ্যে কে বিশ্বাসঘাতকতা করবে ।’’
ছবিটি সান্তামারিয়া কনভেন্টের এক দেওয়ালে আঁকা হয়েছিল । দি লাস্ট সাপার লিওনার্দোর এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি । সমালোচকদের মতে এখানে লিওনার্দোর মানসিকতা, তাঁর ভাবনা কল্পনার সাথে মিলিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি । লাস্ট সাপার শুধু যে একখানি সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্র তাই নয়, মানুষের শিল্প প্রতিভা যে কোন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছতে পারে এ তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ ।
প্রথমে তিনি এঁকেছিলেন যীশুর বারোজন শিষ্যর মুখ । এই শিষ্যদের মুখে ফুটে উঠেছিল বিচিত্র অনুভূতি । কারো মুখে বিস্ময়, কারো মুখ ভয়, কারো বেদনা সন্দেহ । এক আশ্চর্য সুষমার প্রতিটি মুখ জীবন্ত হয়ে উঠেছিল । পরিশেষে তিনি আঁকলেন যীশুর মুখ । এ মুখে ভয় নেই, ঘৃণা নেই, উদ্বেগ নেই । তিনি তো জানতেন তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ হতে হবে । তাঁর কাজ সমাপ্ত হয়েছে । ইশ্বরের ইচ্ছায় এইবার তাকে মর্ত্যজগৎ ত্যাগ করতে হবে । ইশ্বরের ইচ্ছাকে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন । অনুভূতিহীন এক স্বর্গীয় ভাব ফুটে উঠেছে তাঁর মুখে । লাস্ট সাপার ছাড়াও আরো দুটি তৈলচিত্র এঁকেছিলেন লিওনার্দো । ভার্জিন অব দি রকস ও মেসিলিয়া ।
১৪৯৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসী সম্রাট মিলান আক্রমণ করলেন । তিনি মিলান ত্যাগ করে পালিয়ে এলেন ভেনিসে । ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে মিস্টান সম্পূর্ণ পরাজিত হয়ে ফারসী অধিকারে চলে গেল ।
লিওনার্দো আশা করেছিলেন যুদ্ধ মিটে গেলে আবার মিলানে ফিরে যাবেন । কিন্তু যখন সেই আশা পূর্ণ হল না, তিনি ভেনিস ত্যাগ করে রওনা হলেন মাতৃভূমি ফ্লোরেন্সের দিকে । এই সময় সীজার বর্জিয়ার অনুরোধে মধ্য ইতালির বিস্তৃত অঞ্চল পরিদর্শন করে ছটি ম্যাপ তৈরি করেন । সেই ম্যাপগুলি আজও উইন্ডসর লাইব্রেরিতে রক্ষিত আছে । সেগুলো দেখলে অনুমান করা যায় কি নির্ভুল ছিল তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং মানচিত্র অঙ্কন করবার সহজাত দক্ষতা ।
ইতিপূর্বে তিনি একটি ছবি এঁকেছিলেন-ভার্জিন অব দি রকস । ঝুলে পড়া এক পর্বত । তার মধ্যে ফুটে উঠেছে চিরন্তন মানব আত্মার এক রূপ । এই সময় লিওনার্দো আঁকলেন তাঁর জগৎ বিখ্যাত মোনালিসা । এই ছবিটি আঁকতে তাঁর তিন বছর সময় লেগেছিল ।
চিত্রশিল্পী হিসাবে লিওনার্দোর খ্যাতি জগৎ বিখ্যাত হলেও তাঁর মৃত্যুর পর পাওয়া গিয়েছিল প্রায় পাঁচ হাজার পাতার হাতের লেখা পান্ডুলিপি । এই পান্ডুলিপিতে তিনি সমস্ত জীবন ধরে যে সব পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, পরীক্ষা করেছিলেন, তারই বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন । এই পান্ডুলিপি লেখা হয়েছিল ইতালিয়ান ভাষায় এবং সমস্ত পান্ডুলিপিটাইলেখা হয়েছিল উলটো করে । ফলে সোজাসুজি পড়া যেত না । পড়তে হত আয়নার মাধ্যমে । প্রতিটি লেখার সঙ্গে থাকত অসংখ্য ছবি । তাঁর এই পান্ডুলিপিতে অসংখ্য বিষয় নিয়ে লেখা হয়েছে । চীন উপকথা, মধ্যযুগীয় দর্শন, সমুদ্রস্রোতের কারণ,বাতাসের গতি, তার চাপ, পৃথিবীর ওজন । নিশাচর পাখির গতিপ্রকৃতি । পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব । উড়ন্ত যান । সাঁতার কাটবার যন্ত্র । আলোর প্রকৃতি, যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রের নক্সা । সুগন্ধ সেন্ট তৈরির ফর্মূলা । বিভিন্ন পাখি জন্তু-জানোয়ারদের আচার-আচরণ, বিভিন্ন গাণিতিক সূত্র । তাঁর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা এত গভীর ছিল যে গোপনে বিশকিছু মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করে দেখেছিলেন দেহের গঠন । তাঁর এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বেশ কিছু শরীয়তেত্ত্বের ছবি এঁকেছিলেন । সেই ছবি এত নির্ভুল ছিল, পরবর্তীকালে চিকিৎসকরা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে হয়ে গিয়েছিলেন । আধুনিক উড়োজাহাজের তিনিই প্রথম নক্সা আঁকেন ।
১৫১৬ সালে লিওনার্দো ফারসী সম্রাটের আমন্ত্রণে প্যারিসে গেলেন । সম্রাট লিওনার্দোকে খুবই সম্মান করতেন ।
ক্রমশই স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ছিল । ডান হাত অকর্মণ্য হয়ে গিয়েছিল । বাঁ হাতেই তিনি ছবি আঁকতেন । এই সময় তিনি ইশ্বরের প্রতি অনুরক্ত পড়েন । অবশেষে ৬৭ বছর বয়সে, ২রা মে ১৫১৯, চিরদিনের জন্য পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি – ইতালিয় রেঁনেসাসের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ ।

আল ফারাবী
(৮৭০-৯৬৬খ্রিঃ)

মুসলিম জাতির বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই তাদের অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে জানে না । জানার তেমন আগ্রহ ও নেই । আগ্রহ থাকলেও জানার তেমন কোন পথ ও পাথেয় নেই । রাষ্ট্রশক্তি হারা মুসলমানরা তাদের অতীত ঐতিহ্য  ও জ্ঞান বিজ্ঞানকে ধরে রাখতে পারেনি । মুসলমানদের জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা করে অমুসলিম বিশ্ব আজ উন্নত । অন্যদিকে বর্তমান মুসলিম বিশ্ব তাদের পূর্ব পুরুষদের দেয়া জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যকে  হারিয়ে আজ মূর্খ ও পরনির্ভরশীল জাতিতে হয়েছে পরিণত । এমন এক যুগ ছিল যখন সমগ্র বিশ্বের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছিল মুসলমানদের হাতে । জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্প সাহিত্য ও সভ্যতায় মুসলিম জাতি ছিল উন্নত ও শ্রেষ্ঠ । আল্লাহ পাকের আশীর্বাদে মুসলিম জাতির মধ্যে ধন্য মানুষের জন্ম হয়েছিল, যারা ছিল ঐশী জ্ঞানে মহিমান্বিত ।তাঁদের মধ্যে এবং মুসলমানদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত সম্পর্কে হতভাগা মুসলমানদের অনেকেই জানে না । না জানাটাও অস্বাভাবিক নয় । কারন মুসলমানদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে আজ বিকৃত করে রচনা করা হয়েছে । এছাড়া ইউরোপীয় পন্ডিতগণ মুসলিম সভ্যতাকে বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিকগণের অধিকাংশের নামই বিকৃত করে লিপিবদ্ধ করেছে । তাই বর্তমান প্রজন্মের জানতে হতে তাঁদের গৌরবোজ্জ্বল হারানো দিনগুলি সম্পর্কে এবং বিভিন্ন মুসলিম মনীষীদের দেয়া জ্ঞান বিজ্ঞান ও আবিষ্কার সম্পর্কে । অগ্নিপুরুষ সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী বাঙালি মুসলমানদের চোখের সামনে তাঁদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত ইতিহাস তুলে ধরার দুর্বার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন । তিনি তাঁর ‘স্পেন বিজয়’ কাব্য গ্রন্থে যথার্থ লিখেছেন-----
“গাবো সে অতীত কথা,গৌরব কাহিনী,
নাচাইতে মুসলেমের নিস্পদন ধমনী ।
গাবো সে দুর্দম বীর্য দীপ্ত উন্মাদনা,
কৃপা করি অগ্নিময়ী করো এ রসনা ।”
পৃথিবীতে মুসলমানদের উন্নতির জন্যে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আশীর্বাদ হিসেবে যুগে যুগে যে সকল মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের পৃথিবীতে পাঠিয়ে ছিলেন আল ফারাবী তাঁদের অন্যতম । তাঁর জন্ম তারিখ কত তা সঠিকভাবে জানা যায় না । তাঁর তারিখের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে । এর অন্যতম কারণ হল তৎকালীন যুগে কারো জন্ম তারিখ লিপিবদ্ধ করে রাখার ব্যাপারে তেমন কোন গুরুত্ব ছিল না । যতদূর জানা যায় এ মনীষী ৮৭০ খ্রিস্টাব্দে তুর্কিস্তানের অর্ন্তগত ‘ফারাব’ নামক শহরের নিকটবর্তী ‘আল ওয়াসিজ’ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । ‘ফারাব’ নামক শহরের নামানুসারে আবু নাসের মোহাম্মদ পরবর্তীতে ‘আল ফারাবী’ নামে পরিচিত হন । বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী পাঠ করলে দেখা যায়, অনেকেই তাঁদের জন্মস্থান, নিকটবর্তী শহর কিংবা দেশের নামে পরিচিত ছিলেন । আল ফারাবীর ক্ষেত্রেও তার বিপরীত ঘটে নি । ইউরোপীয় পন্ডিতগণ তাঁর নামকে বিকৃত করে ফারাবিয়াস লিপিবদ্ধ করেছে । আল ফারাবীর পিতা ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত এবং সেনাবাহিনীর একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা । তাঁর পূর্ব পুরুষগণ ছিলেন পারস্যের অধিবাসী । ইসলাম ধর্ম গ্রহণ ও রাজনৈতিক কারণে তাঁর পূর্ব পুরুষগণ পারস্য ত্যাগ করে তুর্কিস্তানে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন ।
আল ফারাবী বাল্যকাল থেকেই ছিলেন জ্ঞান পিপাসু । অজানাকে জানার এবং অজেয়কে জয় করার প্রবল আকাঙ্খা ছিল তাঁর হৃদয়ে । তাই জ্ঞান বিজ্ঞানের সাধনায় তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন তাঁর সারাটা জীবন । জ্ঞানের সন্ধানে তিনি ছুটে চলেছেন দেশ থেকে দেশান্তরে । তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয় ফারাবায় । সেখানে কয়েক বছর শিক্ষা লাভের পর শিক্ষার উদ্দেশ্যে চলে যান বোখারায় । এরপর উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্যে তিনি গমন করেন বাগদাদে । সেখানে তিনি সুদীর্ঘ প্রয় ৪০ বছর অধ্যয়ন ও গবেষণা করেন । কয়েকটি ভাষার উপর ছিল তাঁর পূর্ণ দখল । জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ছিলেন তিনি পারদর্শী । দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি আস্তে আস্তে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে । জ্ঞান বিজ্ঞানের এমন কোন শাখা বাকি ছিল না, যেখানে ফারাবীর প্রতিভা বিস্তৃত হয় নি । কিন্তু তারপরও জ্ঞানের পিপাসা তাঁর মিটে নি । জ্ঞানের অন্বেষণে তিনি ছুটে গিয়েছেন দামেস্কে, মিসরে এবং দেশ বিদেশের আরো বহু স্থানে । গবেষণা করেছেন বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা ও প্রশাখা নিয়ে । পদার্থ বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, দর্শন, ‍যুক্তিশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রভৃতিতে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য । তবে বিজ্ঞান ও দর্শনে তাঁর অবদান ছিল সর্বাধিক । পদার্থ বিজ্ঞানে তিনিই ‘শূণ্যতার’ অবস্থান প্রমাণ করেছিলেন । দার্শনিক হিসেবে ছিলেন ‘নিয়প্লেটনিস্ট’দের পর্যায় বিবেচিত । বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক হিসেবে তিনি আরোহণ করেছিলেন জ্ঞানের শীর্ষে ।
একবার রাজা সাইফ আদ দৌলার শাহী দরবারে মনীষী আল ফারাবী উপস্থিত হন । ইতিপূর্বে রাজা বিজ্ঞানী আল ফারাবীর নাম শুনেছিলেন কিন্তু ফারাবীর সাক্ষাৎ পাননি । ফারাবীকে নিকটে পেয়ে রাজা খুব খুশি হন এবং ফারাবীর সাথে জ্ঞান বিজ্ঞান নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন । আলোচনায় ফারাবীর জ্ঞান ও গুণাবলীতে রাজা মুগ্ধ হন এবং তাঁকে খুব সম্মান দেখান । বিজ্ঞানী আল ফারাবী রাজার সংঙ্গী হিসেবে এখানে বেশ কিছুদিন অবস্থান করেন ।
বিজ্ঞানী আল ফারাবী সমাজ বিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিশাস্ত্র প্রভৃতি বিষয়ে বহু রচনা করেছেন । কিন্তু তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক বলে অনেকে উল্লেখ করেছেন । এ সকল অমূল্য গ্রন্থের অধিকাংশেরই সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না । তাঁর রচিত ‘আলা আহলে আল মদীনা আল ফাদিলা (দর্শন ও রাষ্ট্র বিজ্ঞান সম্পর্কিত ) গ্রন্থটি সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য । সমাজ বিজ্ঞান সম্পর্কে ও তার রচিত কয়েকটি গ্রন্থ তাঁকে বিখ্যাত করেছে । তিনি আজ পৃথিবীতে বেঁচে নেই । কিন্তু মুসলিম জাতির কল্যাণে তিনি জ্ঞান বিজ্ঞানের যে মৌলিত আবিষ্কার রেখে গেছেন তা চর্চা করলে মুসলমানরা আজও জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নতি লাভ করতে পারবে । তিনি কত সালে ইন্তেকাল করেন তা নিয়ে মতভেদ আছে । যতদূর জানা যায় তিনি ৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেছিলেন ।

 

আর্কিমিডিস
(২৮৭-২১২খ্রীস্ট পূর্ব)

সাইরাকিউসের সম্রাট হিয়েরো এক স্বর্ণকারকে দিয়ে একটি সোনার মুকুট তৈরি করেছিলেন । মুকুটটি হাতে পাওয়ার পর সম্রাটের মনে হল এর মধ্যে খাদ মিশানো আছে । কিন্তু স্বর্ণকার খাদের কথা অস্বীকার করল । কিন্তু সম্রাটের মনের সন্দেহ দূর হল না । তিনি প্রকৃত সত্য নিরূপণের ভার দিলেন রাজদরবারের বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের উপর ।
মহা ভাবনায় পড়ে গেলেন আর্কিমিডিস । সম্রাটের আদেশে মুকুটের কোন ক্ষতি করা যাবে না । আর্কিমিডিস ভেবে পান না মুকুট না ভেঙে কেমন করে তার খাদ নির্ণয় করবেন । কয়েকদিন  কেটে গেল । ক্রমশই অস্থির হয়ে ওঠেন আর্কিমিডিস । একদিন দুপুরবেলায় মুকুটের কথা ভাবতে ভাবতে সমস্ত পোশাক খুলে চৌবাচ্চায় স্নান করতে নেমেছেন । পানীতে শরীর ডুবতেই আর্কিমিডিস লক্ষ্য করলেন কিছুটা পানি চৌবাচ্চা থেকে উঠে পড়লেন । তিনি ভুলে গেলেন তাঁর শরীরে কোন পোশাক নেই । সমস্যা সমাধানের আনন্দের নগ্ন অবস্থাতেই ছুটে গেলেন রাজ দরবারে ।
মুকুটের সমান ওজনের সোনা নিলেন । একপাত্র পানিতে মুকুটটি ডোবালেন । দেখা গেল খানিকটা পানি উপছে পড়ল । এইবার মুকুটের ওজনের সমান সোনা নিয়ে জলপূর্ণ পাত্রে ডোবানো হল । যে পরিমাণ পানি উপছে পড়ল তা ওজন করে দেখা গেল আগের উপছে পড়া পানি থেকে তার ওজন আলাদা । আর্কিমিডিস বললেন, মুকুটে খাদ মেশানো আছে । কারণ যদি মুকুট সম্পূর্ণ সোনার হত তবে দুটি ক্ষেত্রেই উপছে পড়া পানির ওজন সমান হত ।
এই আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হল একটি বৈজ্ঞানিক সূত্র । “তরল পদার্থের মধ্যে কোন বস্তু নিমজ্জিত করলে সেই বস্তু কিছু পরিমাণে ওজন হারায় । বস্তু যে পরিমাণে ওজন হারায় সেই পরিমাণ ওজন বস্তুর অপসারিত তরল পদার্থের ওজনের সমান।” এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আর্কিমিডিসের সূত্র নামে বিখ্যাত ।
আর্কিমিডিসের জন্ম আনুমানিক খ্রীস্টপূর্ব ২৮৭ সালে । সিসিলি দ্বীপপুন্জ্ঞের অন্তর্গত সাইরাকিউস দ্বীপে । পিতা ফেইদিয়াস ছিলেন একজন জ্যোতির্বিদ ।
কৈশোর ও যৌবনে তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় গিয়ে পড়াশুনা করেছেন । সেই সময় আলেকজান্দ্রিয়া ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার পীঠস্থান । ছাত্র অবস্থাতেই আর্কিমিডিস তাঁর অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও সমধুর ব্যক্তিত্বের জন্য সর্বজন পরিচিত হয়ে ওঠেন । তাঁর গুরু ছিলেন ক্যানন । ক্যানন ছিলেন জ্যামিতির জনক মহান ইউক্লিডের ছাত্র ।পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি চেয়েছিলেন গণিতবিদ হবেন । অঙ্কশাস্ত্র, বিশেষ করে জ্যামিতিতে তাঁর আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি । ইউক্লিড, ক্যানন যেখানে তাঁদের বিষয় সমাপ্ত করেছিলেন আর্কিমিডিস সেখান থেকেই তাঁর কাজ আরম্ভ করেন ।
আর্কিমিডিস যুদ্ধকে ঘৃণা করতেন । কারো আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করাও তাঁর প্রকৃতিবিরুদ্ধ ছিল । কিন্তু যেহেতু তিনি ছিলেন সাইরাকিউসের প্রজা, সম্রাট হিয়েরার রাজকর্মচারী তাই নিরুপায় হয়েই তাঁকে সম্রাটের আদেশ মেনে চলতে হত ।
সম্রাটের আদেশই তিনি প্রায় ৪০ টি আবিষ্কার করেন । তার মধ্যে কিছু ব্যবসায়ীকে জিনিস হলেও অধিকাংশই ছিল সামরিক বিভাগের প্রয়োজন ।
আর্কিমিডিসের একটি আবিষ্কার পুল ও লিভার । একবার কোন একটি জাহাজ চরায় এমনভাবে আটকে গিয়েছিল যে তাকে আর কেনভাবেই পানিতে ভাসানো সম্ভব হচ্ছিল না । আর্কিমিডিস ভালভাবে সব কিছু পর্যবেক্ষণ করলেন । তাঁর মনে হল একমাত্র যদি এই জাহাজটাকে উঁচু করে তোলা যায় তবেই জাহাজটাকে পানিতে ভাসান সম্ভব । আর্কিমিডিসের কথা শুনে সকলে হেসেই উড়িয়ে দিল ।
অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই উদ্ভাবন করলেন লিভার আর পুলি । জাহাজঘাটে এটা উঁচু জায়গার লিভার খাটাবার ব্যবস্থা করলেন । তার মধ্যে বিরাট একটা দড়ি বেঁধে দিলেন । দড়ির একটা প্রান্ত জাহাজের সঙ্গে আষ্টে-পিষ্টে বাঁধা হল ।
এই অদ্ভুত ব্যাপার দেখতে সম্রাট হিয়েরো নিজেই এলেন জাহাজ ঘাটায় । নগর ভেঙে যেখানে যত মানুষ ছিল সকলে জড় হয়েছে । আর্কিমিডিস সম্রাটকে অনুরোধ করলেন লিভার লাগানো দড়ির আরেকটা প্রান্ত ধরে টানতে । আর্কিমিডিসের কথায় সম্রাট তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে দড়িটা ধরে টান দিলেন । সাথে সাথে অবাক কান্ড । নড়ে উঠল জাহাজটা । চারদিকে চিৎকার উঠল । এবার সম্রাটের সাথে দড়িতে হাত লাগালেন আরো অনেকে । সকলে মিলে টান দিতেই সত্যি সত্যি জাহাজ শূন্যে উঠতে আরম্ভ করল । সম্রাট আনন্দে বুকে জুড়িয়ে ধরলেন আর্কিমিডিসকে ।
এই আবিষ্কারের ফলে বড় বড় পাথর, ভারী জিনিস, কুয়া থেকে জল তোলার কাজ সহজ হল । একবার আর্কিমিডিস গর্ব করে বলেছিলেন, আমি যদি পৃথিবীর বাইরে দাঁড়াবার একটু জায়গা পেতাম তবে আমি আমার এই লিভার পুলির সাহায্যে পৃথিবীটাকেই নাড়িয়ে দিতাম ।
সৈনিকটি বলে উঠল, তুমি আমার সঙ্গে চল, আমাদের সেনাপতি তোমার খোঁজ করছেন ।
বৃদ্ধ আর্কিমিডিস বলে উঠলেন, আমি এখন ব্যস্ত আছি । কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোথাও যেতে পারব না ।
এ ধরণের কথা শোনবার জন্য প্রস্তুত ছিল না রোমান সৈন্যটি । তাকে যে আদেশ দেওয়া হয়েছে তাকে তা পালন করতেই হবে । আর্কিমিডিসের হাত ধরতেই এক টানে ছাড়িয়ে নিলেন আর্কিমিডিস ।
আমার কাজ শেষ না হলে কোথাও যেতে পারব না ।
আর সহ্য করতে পারল না সৈনিক । পরাজিত দেশের এক নাগরিকের এতদূর স্পর্ধা, তার হুকুম অগ্রাহ্য করে ! একটানে কোমরের তলোয়ার বার করে ছিন্ন করল মহা বিজ্ঞানীর দেহ । রক্তের ধারায় শেষ হয়ে গেল তাঁর অসমাপ্ত কাজ ।
আর্কিমিডিসকে হত্যা করা হয়েছিল সম্ভবত খ্রীস্টপূর্ব ২১২ সালে ।  বিজ্ঞানীর ছিল মুন্ডু দেখে গভীরভাবে দুঃখিত হয়েছিলেন মার্কিউলাস । তিনি মর্যাদার সাথে আর্কিমিডিসের দেহ সমাহিত করেন ।
মহাবিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের আবিষ্কার সম্বন্ধে সঠিক কোনতথ্য জানা যায় না । সামরিক প্রয়োজনে যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করলেও ঐ বিষয়ে তার কোন আগ্রহ ছিল না । মূলত গাণিতিক বিষয়েই ছিল তাঁর আগ্রহ । দিনের অধিকাংশ সময়েই তিনি গবেষণায় নিমগ্ন থাকতেন । বাইরের জগতের সব কথাই তিনি তখন ভুলে যেতেন । এমন বহু সময় গিয়েছে তাঁর কাজের লোক তাঁকে খাবার দিয়ে গিয়েছে, সারাদিনে তিনি সেই কাবার স্পর্শই করেননি । ভুলেই গিয়েছেন খাবার কথা । আবার কখনো স্নান করতে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা সেখানেই কাটিয়ে দিতেন । খোঁজ করতে দেখা গেল তিনি স্নানাগারের দেওয়ালেই অঙ্ক কষে চলেছেন । বলবিদ্যা, জ্যামিতি, জ্যোতিবিদ্যা সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর রচনার সংখ্যা বারোটি । এছাড়াও তিনি আর যে সমস্ত রচনা করেছিলেন তার কোন সন্ধান পাওয়া যায় না ।
গণিত সংক্রান্ত ব্যাপারে আর্কিমিডিসের উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হল ---------
(১) বৃত্তের পরিধি এবং ব্যাসের অনুপাত ৩10/৭১ ও ৩1/৭ এর মধ্যে অবস্থিত ।
(২) অধিবৃত্তীয় অংশগুলোর ক্ষেত্রফল নির্ধারণ করেছিলেন ।
(৩) শঙ্ককৃতি এবং গোলাকৃতি বস্তুর সম্বন্ধে ৩২ টি প্রতিজ্ঞা উদ্ভাবন করেছিলেন ।
(৪) বলবিদ্যার তত্ত্বের ভীত হিসাবে সমতল ক্ষেত্রের সাম্যতা সম্বন্ধে তত্ত্ব নির্ধারণ করেন ।
তাঁর বহু আবিষ্কৃত সত্য আজও বিজ্ঞানীদের পথ নির্দেশ করে । ‍

 


অ্যারিস্টটল
(খ্রী: পূর্ব ৩৮৪-৩২২)

বিশ্ববিজয়ী বীর সম্রাট আলেকজান্ডার দুঃখ করে বলেছিলেন জয় করবার জন্য পৃথিবীর আর কোন দেশই বাকি রইল না । তাঁর শিক্ষক মহাপন্ডিত অ্যারিস্টটল সম্বন্ধেও একই কথা প্রযোজ্য । জ্ঞানের এমন কোন দিক নেই তিনি যার পথপ্রদর্শক নন । তাঁর Politics গ্রন্থ আধুনিক রাষ্ট্রনীতির সূচনা করেছে । Poetice গ্রন্থের নাট্যতত্ত্ব কাব্যতত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছেন । আধুনিক
জীবনবিজ্ঞানের তিনিই জনক । বহু দার্শনিক তত্ত্বের প্রবক্তা ।
তাঁর চিন্তা জ্ঞান মনীষা প্রায় দু্ই হাজার বছর ধরে মানব সভ্যতাকে বিকশিত করেছিল ।
৩৮৪ খ্রীস্ট পূর্বে থ্রেসের অন্তর্গত স্তাজেইরা শহরে অ্যারিস্টটল জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর পিতা ছিলেন চিকিৎসক । নাম নিকোমাকাস ।

শৈশবে গৃহেই পড়াশুনা করেন অ্যারিস্টটল । ১৭ বছর বয়েসে পিতা-মাতাকে হারিয়ে গৃহত্যাগ করেন । ঘুরতে ঘুরতে তিনি এথেন্সে এসে উপস্থিত হন । সেই সময় এথেন্স ছিল শিক্ষার কেন্দ্র সক্রেটিসের শিষ্য প্লেটো গড়ে তুলেছেন নতুন এ্যাকাডেমি । সেখানে ভর্তি হলেন অ্যারিস্টটল । অল্প দিনের মধ্যেই নিজের যোগ্যতায় তিনি হয়ে উঠলেন এ্যাকাডেমির সেরা ছাত্র । প্লেটোও তাঁর অসাধারণ বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন । শিক্ষাদান ছাড়াও নানান বিষয় নিয়ে গবেষণার কাজ করতেন অ্যারিস্টটল তর্কবিদ্যা, অধিবিদ্যা, প্রকৃতিবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান,নীতিশাস্ত্র । অল্প দিনের মধ্যেই তাঁর গভীর জ্ঞান, অসাধারণ পান্ডিত্যের কথা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল । ম্যাসিডনের রাজা ফিলিপেরও অজ্ঞাত ছিল না । পুত্র আলেকজান্ডারের জন্ম সময়েই তাঁর শিক্ষার ভার অর্পণ করেন অ্যারিস্টটলের উপর । তখন অ্যারিস্টটল আটাশ বছরের যুবক ।
আলেকজান্ডার যখন তেরো বছরের কিশোর, রাজা ফিলিপের আমন্ত্রণে অ্যারিস্টটল এসে তাঁর শিক্ষার ভার গ্রহণ করলেন । শ্রেষ্ঠ গুরুর দিগ্বিজয়ী ছাত্র । বহু প্রাচীন ঐতিহাসিকের ধারণা অ্যারিস্টটলের শিক্ষা উপদেশই আলেকজান্ডার অদম্য মনোবল লৌহকঠিন দৃঢ় চরিত্র গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল । প্রকৃতপক্ষে একজনের ছিল সমগ্র পৃথিবীকে জয় করে তার উপর প্রভূত্ব করবার প্রবল ইচ্ছা । অন্য জনের ছিল জ্ঞানের নতুন নতুন জগৎ আবিষ্কার করে মানুষের জন্য তাকে চালিত করার ইচ্ছা ।
অ্যারিস্টটলের প্রতি রাজা ফিলিপের ও ছিল গভীর শ্রদ্ধা । শুধু পুত্রের শিক্ষক হিসাবে নয়, যথার্থ জ্ঞানী হিসাবেও তাকে সম্মান করতেন । অ্যারিস্টটলের জন্মস্থান স্তাজেইরা কিছু দুবৃত্তের হাতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল । সেখানকার বহু মানুষ বন্দী জীবন যাপন করছিল । রাজা ফিলিপ অ্যারিস্টটলের ইচ্ছায় শত্রু সেনার হাত থেকে শুধু স্তাজেইরা উদ্ধার করেননি, ধ্বংস্তূপের মধ্যে থেকে শহরকে নতুন করে গড়ে তুললেন ।
অ্যারিস্টটল একদিকে ছিলেন মহাজ্ঞানী, অন্যদিকে সার্থক শিক্ষক ‍। তাই গুরুর প্রতি আলেকজান্ডারের ছিল অসীম শ্রদ্ধা । তিনি বলতেন, পিতার কাছে পেয়েছি আমার এই জীবন আর গুরুর কাছে শিক্ষালাভ করেছি কিভাবে এই জীবনকে সার্থক করা যায় তার জ্ঞান । যখন অ্যারিস্টটল জীবন বিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণার কাজ করছিলেন, আলেকজান্ডার তাঁর সাহায্যের জন্য বহু মানুষকে নিযুক্ত করেছিলেন, যাদের কাজ ছিল বিভিন্ন ধরনের মাছ, পাখি, জীবজন্তুদের জীবন পর্যবেক্ষণ করা, তার বিবরণ সংগ্রহ করে পাঠানো । দেশ-বিদেশের যেখানেই কোন পুথি পান্ডুলিপির সন্ধান পাওয়া যেত,আলেকজান্ডার যে কোন মূল্যেই হোক সেই পুঁথি পান্ডুলিপি সংগ্রহ করে গুরুর হাতে তুলে দিতেন ।
যখন আলেকজান্ডার এশিয়া জয়ের নেশায় সৈন্যবাহিনী নিয়ে বার হলেন, অ্যারিস্টটল ফিরে গেলেন এথেন্সে । তখন এথেন্স ছিল শিল্প সংস্কৃতি শিক্ষার পীঠস্থান । এখানেই স্কুল স্থাপন করলেন অ্যারিস্টটল । তখন তাঁর বয়স পঞ্চাশ বছর । স্কুলের নাম রাখা হল লাইসিয়াম । কারণ কাছেই ছিল গ্রীক দেবতা লাইসিয়ামের মন্দির ।
৩২৩ খ্রীস্টপূর্বে আলেকজান্ডারের আকস্মিক মৃত্যু হল । এতদিন বীর ছাত্রের ছত্রছায়ায় যে জীবন যাপন করতেন তাতে বিপর্যয় নেমে এল । কয়েকজন অনুগত ছাত্রের কাছ থেকে সংবাদ পেলেন তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে । সক্রেটিসের অন্তিম পরিণতির কথা অজানা ছিল না অ্যারিস্টটলের । তাই গোপনে এথেন্স ত্যাগ করে হউরিয়া দ্বীপে গিয়ে আশ্রয় নিলেন । কিন্তু এই স্বেচ্ছানির্বাসের যন্ত্রণা বেশিদিন ভোগ করতে হয়নি অ্যারিস্টটলকে । ৩২২ খ্রীস্ট পূর্ব তাঁর মৃত্যু হল ।
অ্যারিস্টটলের এই সব ভ্রান্ত মতামত কয়েক শতাব্দী ধরে সমাজকে চালিত তার জন্যে অ্যারিস্টটলকে অভিযুক্ত করা যায় না । উত্তরকালের মানুষেরই দায়িত্ব ছিল তাঁর গবেষণার সঠিক মূল্যায়ন করা । কিন্তু সে কাজে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল ।
সমস্ত ভ্রান্তি থাকা সত্ত্বেও অ্যারিস্টটল মানব ইতিহাসের এক শ্রেষ্ঠতম প্রজ্ঞা – যার সৃষ্ট জ্ঞানের আলোয় মানুষ নিজেকে সমৃদ্ধ করেছে,মহত্তর পর্যায়ে উন্নীত করেছে ।

MKRdezign

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget