Articles by "Biography"

মেরিলিন আহমেদ

দেশে বসেই বিদেশের চার প্রতিষ্ঠান সামলাচ্ছেন তিনি। আয়ের অঙ্ক শুনলে যে কারও চোখ কপালে উঠে যাবে। অনলাইনের একটি মার্কেটপ্লেস থেকেই তাঁর মাসে গড়ে দুই লাখ টাকা আয় হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন মার্কেটপ্লেস আপওয়ার্কে শীর্ষ আয়ের তালিকায় জ্বলজ্বল করছে তাঁর নাম। তিনি বাংলাদেশি তরুণী মেরিলিন আহমেদ। ফ্রিল্যান্সিংয়ে বাংলাদেশের মেয়েদের অনেকখানি এগিয়ে যাওয়ার বার্তা বহন করছেন মেরিলিন।
দেশে বসেই বিদেশের চারটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কর্মী নিয়োগ দেওয়া, মানবসম্পদ বিভাগ দেখাসহ প্রতিষ্ঠানের গুরুদায়িত্ব পালন করছেন মেরিলিন আহমেদ। ফ্রান্সের একটি কোম্পানি তাঁকে সে দেশে চলে যেতে বললেও তিনি দেশেই গড়ে তুলতে চাইছেন মানবসম্পদ নিয়ে কাজ করে এমন একটি প্রতিষ্ঠান। ফ্রিল্যান্সিং জীবন নিয়ে সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর।
ব্যবসা ও চাকরির পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিংয়ে যুক্ত থাকলেও মেরিলিন আহমেদ নিজেকে পুরোপুরি ফ্রিল্যান্সার হিসেবেই পরিচয় দেন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ, এমবিএ ও পরবর্তী সময়ে মানবসম্পদ–বিষয়ক ডিপ্লোমা পিজিডিএইচআর করে দেশের কয়েকটি নামকরা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন।
সামলেছেন দেশের বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্ব। কিন্তু চাকরির বাঁধাধরা সময় তাঁর পছন্দ হয়নি বলে বেছে নেন ফ্রিল্যান্সিং পেশাটাকে। কারণ, এখানে নিজের স্বাধীন সময়মতো কাজ করার সুবিধা আছে। এর বাইরে নিজের সুবিধাজনক সময়কে চাকরির জন্য বেছে নিয়েছেন। গত এক বছর দেশের ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পিজিডিএইচআর কোর্স পড়াচ্ছেন। সঙ্গে নিজের ব্যবসা শুরু করে আয়ের পরিধিটুকু বাড়িয়ে নিতে পেরেছেন বহু গুণ। একসঙ্গে এখন তিন ধরনের কাজ সামলাচ্ছেন মেরিলিন।
মেরিলিন জানালেন, ফ্রিল্যান্সিং জগতে তিনি প্রধানত মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক ও প্রকল্প পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। বাংলাদেশ থেকে এ ধরনের ফ্রিল্যান্সার হাতে গোনা। তিনি আপওয়ার্কের শীর্ষ আয়ের ফ্রিল্যান্সারদের একজন। সরকারের কাছ থেকেও স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁকে এখন ফ্রান্সের ২৫০ জনের বেশি কর্মী আছে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগ দেখতে হয়। সেখানে ১৮টিরও বেশি দেশের লোক একসঙ্গে যাঁর যাঁর দেশ থেকে কাজ করছেন।
এর বাইরে আরও তিনটি প্রতিষ্ঠানের হয়ে খণ্ডকালীন কাজ করছেন মেরিলিন। বিভিন্ন দেশের কর্মীদের নিয়োগ দিতে সাক্ষাৎকার নেওয়া, প্রতিষ্ঠানের জন্য দরকারি কর্মী সংগ্রহ, কর্মীদের ছুটি, বেতন ও নীতিমালা তৈরিসহ নানা বিষয় তাঁকে দেখতে হয়। মেরিলিন জানালেন, গত তিন বছরে তিনি অনলাইনে নিয়োগ দিয়েছেন ৪৫০ জনেরও বেশি আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্স কর্মীকে।
ওই চারটি প্রতিষ্ঠানের জন্য তাঁর কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা তাঁর ওপর ভরসা করেন। সরাসরি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ কারণে তাঁদের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে কাজ করতে হয়। পুরো কাজ করতে হয় অনলাইনে। সময়ের ব্যবধানের সুবিধা হিসেবে তিনি ইউরোপীয় গ্রাহকদের সঙ্গেই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
যেভাবে ফ্রিল্যান্সিংয়ে এলেন
জবাবে মেরিলিন জানান, ব্যবসায় প্রশাসন বিষয়ে পড়াশোনা করে ফ্রিল্যান্সিংয়ে আসার ইচ্ছে কখনো ছিল না। সে সময় ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রসার ও প্রভাব সম্বন্ধে জানাও ছিল না। তবে করপোরেট চাকরি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে বিকল্প চিন্তা করছিলেন। চাকরি ছেড়ে তখনই এ পথে আসা। তবে শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। তিনি মার্কেটপ্লেসগুলো নিয়মিত ঘেঁটেছেন। কাজ খুঁজেছেন। অনেকের মতোই ডেটা এন্ট্রি, লেখালেখির মতো কাজগুলো পেতে আবেদন শুরু করেন। সেটা ২০১৩ সালের দিকে।
এরপর প্রথম কাজ পেতেই ছয় মাস সময় লাগে। তিনি ধৈর্য হারাননি। প্রথম কাজ সফলভাবে শেষ করার পর আরও কয়েকটি কাজ করেন। কিন্তু তিনি যে বিষয়ে দক্ষ, সে বিষয়টিতে কাজ পাচ্ছিলেন না। এর মধ্যে শুরু করেন নিজের প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা। সেই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে ও আয় বাড়াতে ফ্রিল্যান্সিংকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। একসময় কাজ পেয়ে যান এক বিদেশি গ্রাহকের, যার সঙ্গে পরে অনলাইনের বাইরেও নিজের মানবসম্পদবিষয়ক পরামর্শ ব্যবসা শুরু করেন তিনি।
মেরিলিন থাকেন রাজধানীর বনশ্রীতে। তাঁর কার্যালয় পান্থপথে। বাবা–মায়ের বড় সন্তান তিনি। ছোট দুই ভাই আছেন, যাঁরা তাঁদের আপন পেশার ক্ষেত্রে সফল। প্রকৌশলী বাবা ও গৃহ ব্যবস্থাপক মায়ের সান্নিধ্যে মেরিলিনের ছোটবেলা কেটেছে লিবিয়ায়। সেখানে বাংলা মাধ্যমে পড়েছেন। ১০ বছর বয়সে দেশে চলে আসেন। এরপর থেকে তিনি দেশের প্রচলিত মাধ্যমে পড়েছেন। এখন তিনি মানবসম্পদ–বিষয়ক পরামর্শ, নিয়োগ ও নীতিমালা তৈরির কাজগুলো করছেন। আর অবসর মুহূর্তগুলো আজকাল তিনি বিদেশ ভ্রমণ করে কাটান।
কীভাবে এত সব সামলাচ্ছেন? এর জবাবে হেসে মেরিলিন বললেন, সবাই জয়টা দেখতে পায়। পেছনের কঠোর অধ্যবসায়, নিদ্রাহীন রাত, অশেষ ধৈর্য আর সুচিন্তিত পদক্ষেপগুলো কেউ দেখতে পায় না। তাঁর জয়ের মন্ত্র একটাই—নিজের সবচেয়ে ভালোটা দেওয়া। টাকার দিকে চেয়ে নয়; বরং মন দিয়ে পরিশ্রমের মাধ্যমে সাফল্য পেয়েছেন। নিজেকে প্রমাণে নিজের সিদ্ধান্তই প্রয়োগ করতে হবে—এই তাড়নাটুকুও টেনে নিয়ে এসেছে অনেকখানি।
মেরিলিন জানান, ফ্রিল্যান্সিংকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে পরিবারের দিক থেকে সমর্থন পেয়েছেন তিনি। তবে বড় প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার জন্য শুনতে হয়েছে তির্যক মন্তব্য। শুরুতে বাবা–মায়ের কিছুটা আপত্তি থাকলেও পরে তাঁরা পাশে দাঁড়িয়েছেন। শুরুতে ফ্রিল্যান্সিংয়ে নিজেকে মানিয়ে নিতেও কিছুটা সময়ের দরকার হয়েছে। কী করে ভালো ক্লায়েন্ট পাওয়া যায়, তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের সেবা দিতে এখনো নিজেকে প্রতিনিয়ত তৈরি করে যাচ্ছেন। নতুন নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হচ্ছে। শিখতে হচ্ছে।
নতুনদের জন্য পরামর্শ
নতুন যাঁরা ফ্রিল্যান্সিং পেশায় আসতে চান, তাঁদের জন্য ভাষাগত কোনো বাধা দেখেন না মেরিলিন। তাঁর মতে, কাজ শিখে পেশাদার মনোভাব নিয়ে এগোলে সফল হওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে গুগল, ইউটিউবসহ নানা শেখার উপকরণ রয়েছে। আগে শিখতে হবে, চর্চা করতে হবে। এরপর মেন্টরিং। ফ্রিল্যান্সিং পেশায় কেউ কাউকে কাজ দিতে পারে না। নিজের কাজ নিজের যোগ্যতায় আদায় করতে হয়। একজন ভালো মেন্টর অবশ্য কাজে আসতে পারে। তবে নিজের বস নিজেকেই হতে হবে।
মেরিলিন বলেন, যাঁরা সন্তান জন্মের পর চাকরি ছেড়ে বসে থাকেন, তাঁরা এ পেশায় আসতে পারেন। এ ছাড়া ঘরে বসে থাকার চেয়ে কাজ শেখাকে গুরুত্ব দেন তিনি। বলেন, বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আগে দক্ষতা বাড়াতে হবে। আজকাল ফ্রিল্যান্সিংয়ের ওপর ভালো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা সরকারি ও বেসরকারি, দুই পর্যায়েই আছে।
অনেকে ইউটিউব, ফেসবুকেও টিউটোরিয়াল দিয়ে থাকেন। পাশাপাশি বইও পাওয়া যায় প্রচুর। আর কিছু না হোক, নিজে থেকে অনলাইন সার্চ করেও জেনে নেওয়া যায় প্রাথমিক অনেক তথ্য। এরপর কাজে নামতে পারেন। শুরুতেই কাজের আশা না করে, নিজের যোগ্যতা বুঝে এগোতে হবে। রাতারাতি সাফল্য আসে না।
মেরিলিনের মতে, ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে কিছু ভ্রান্ত ধারণা আছে। ঢালাওভাবে ফ্রিল্যান্সিং সবার জন্য—এ ধারণাটা ভুল। আবার যাঁদের দেশীয় বাজারে কাজ নেই, ফ্রিল্যান্সিং তাঁদের জন্য, সেই ধারণাও ভুল। তবে আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে কাজ করার দক্ষতা থাকলে কারও ভাবাভাবির দিকে না চেয়ে কাজ শুরু করে দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, কাজ যেন চাইতে না হয়, কাজই যেন আপনাকে খুঁজে নেয়, সেভাবে এগোতে হবে। এ লক্ষ্যেই নিজের একটি আন্তর্জাতিক মানের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন বলে জানালেন। সূত্রঃ প্রথম আলো।

কাজী নজরুল ইসলাম
( ১৮৯৯-১৯৭৬ খ্রীঃ)

বাংলা ১৩০৬ সালের ১১ ই জ্যৈষ্ঠ মোতাবেক ১৮৯৯ সালের ২৫শে মে বর্ধমান জেলার আসনসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে এক সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কবি একাধিক ভাগ্যবান কবির ন্যায় সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম লাভ করেননি। চুরুলিয়ার কাজী বংশ এক কালে খুবই সম্ভান্ত ছিল বটে; কিন্তু যে সময়ে কবি নজরুল ইসলাম শিশু হয়ে আবির্ভূত হন, সে সময় এ বংশটি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নানা রকম বঞ্চনা ও শোষণের শিকার হয়ে আভিজাত্যের পশ্চাৎপট থেকে সম্পূর্ণ স্ফলিত হয়ে দৈন্যদশার একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে  পড়েছিল।  অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, অপমান এবং মর্মান্তিক দারিদ্র্যে মধ্যে দিয়ে কবির বাল্য, কৈশোর ও প্রাক যৌবন কেটেছে। পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ এবং মাতার নাম জাহেদা খাতুন। ‘কাজী’ হচ্ছে তাঁদের বংশের উপাধি। পিতা ছিলেন স্থানীয় মসজিদে ইমাম এবং মাজারের  মুত্তাওয়াল্লি। ফলে ছোট বেলা থেকেই কাজী নজরুল ইসলাম ইসলামী চিন্তা ও ভাবধারার ভিতর দিয়ে বড় হন।


বাল্যকালে তিনি বাড়ীর নিকটস্থ মাদ্রাসায় (মক্তব) শিক্ষা জীবন শুরু করেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি সুমধুর কণ্ঠে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করতে পারতেন। বাল্যকালেই পবিত্র কুরআনের অর্থ ও তার মর্মবাণী শিক্ষা লাভ করতে শুরু করেন। এছাড়া তিনি বাংলা ও আরবী ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি মক্তবে ফারসী ভাষাও শিখতে থাকেন। হঠাৎ করে তাঁর পিতা মারা যান তিনি নিতান্তই ইয়াতীম হয়ে পড়েন। সংসারে নেমে আসে অভাব অনটন  ও দুঃখ-দুর্দশা। লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হয়ে  যায়। এরপর তিনি ‘লেটো’ গানের দলে যোগ দেন এবং খুব কম সময়ের মধ্যেই তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেন। ‘লেটো’ গানের দলে কোন অশ্লিল গান পরিবেশন হতো না বরং বিভিন্ন পালা গান, জারি গান, মুর্শিদী গান ইত্যাদি পরিবেশিত হত। অসামান্য প্রতিভার বলে তিনি ‘লেটো’ দলের প্রধান নির্বাচিত হন। ‘লেটো’ গানের দলে থেকেই তিনি বিভিন্ন বইপত্র পড়ে সাহিত্য চর্চা চালিয়ে যান। এ সময়ে তিনি কয়েকটি কবিতা, ছড়া গান, পালা গান রচনা করে অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দেন। এর পর তিনি শিক্ষা লাভের জন্যে  গ্রামের কয়েকজন ব্যক্তির সহযোগিতায় রাণীগঞ্জের শিয়ালসোল রাজ স্কুলে ভর্তি হন।


শৈশব কাল থেকে তিনি ছিলেন একটু চঞ্চল প্রকৃতির। স্কুলের বাঁধা ধরা নিয়ম কানুন তিনি সহ্য করতে পারতেন না। তাই হঠাৎ করে একদিন স্কুল থেকে উধাও হন তিনি। কিন্তু কোথায় যাবেন, কি খাবেন, কি করে চলবেন ইত্যাদি চিন্তা করে এবং আর্থিক অভাব অনটনের কারণে তিনি আসানসোলের এক রুটির দোকানে মাত্র ৫  টাকা মাসিক বেতনে চাকুরী গ্রহণ করেন। রুটি তৈরির ফাঁকে ফাঁকে তিনি বিভিন্ন কবিতা, গান, গজল, পুঁথি ইত্যাদি রচনা করেন এবং বিভিন্ন বইপত্র পড়ে তাঁর জ্ঞান ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করতে লাগলেন। তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে জনৈক পুলিশ ইন্সপেক্টর তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন এবং ময়মনসিংহ জেলার দরিরামপুর হাই স্কুলে ভর্তি করে দেন। এরপর তিনি পুনরায় রাণীগঞ্জের শিয়ালসোল রাজ স্কুলে ভর্তি হন।
১৯১৭ সালে বিশ্বযু্দ্ধের সময় তিনি দশম শ্রেণীর ছাত্র। যুদ্ধের কারণে তাঁর আর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া হল না। তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ৪৯ নম্বর বাঙালী পল্টন রেজিমেন্টের হাবিলদার পদে প্রমোশন লাভ করেন। সৈনিক জীবনে তাঁকে চলে যেতে হয় পাকিস্তানের করাচিতে। কিন্তু তাঁর কবিতা ও সাহিত্য চর্চা থেমে যায়নি। করাচি সেনা নিবাসে সহকর্মী একজন পাঞ্জাবী মৌলবী সাহেবের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। তাঁর নিকট তিনি ফারসী ভাষা শিক্ষা লাভ করেন এবং মহা কবি হাফিজ, শেখ সাদী (রঃ) প্রমুখ বিশ্ববিখ্যাত কবিদের রচনাবলী চর্চা করেন। এরপর থেকেই তিনি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, হামদ নাত, গজল, সাহিত্য ইত্যাদির ব্যাপক রচনার তাগিদ অনুভব করেন। কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের তেমন কোন সুযোগ না পেলেও অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে তিনি তাঁর কাব্য ও সাহিত্য চর্চা চালিয়েছিলেন। যুদ্ধ থেমে গেলে ১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসে পল্টন রেজিমেন্ট ভেঙ্গে দেয়ার পর তিনি ফিরে আসেন নিজ মাতৃভূমি চুরুলিয়া গ্রামে। এরপর শুরু হয় তাঁর একনিষ্ঠ কাব্য চর্চা। তাঁর লেখা একাধারে ‘দৈনিক বসুমতি’, ‘মুসলিম ভারত’, ‘মাসিক প্রবাসী’, ‘বিজলী’, ‘ধূমকেতু’ প্রভৃতি বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছাপা হতে থাকে।
নজরুলের কবিতা তদানীস্তন রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত ও বঞ্চিত মানুষদের জাগরণের তিনি ছিলেন মহান প্রবক্তা। ১৯২১ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত অমর কবিতা ‘বিদ্রোহী’ যা সাহিত্যে তাঁকে ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে অমর করে রেখেছে।
বল বীর
বল চির উন্নত মম শির
শির নেহারি নত শির ওই
শিখর হিমাদ্রির।
দেশ প্রেমিক কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠীর শোষণ ও জুলুমের বিরুদ্ধে তাঁর কলমকে অস্ত্র ও বুলেট হিসেবে ব্যবহার শুরু করলেন। ইতিমধ্যে সমগ্র দেশে শুরু হয়েছে ব্রিটিশ বিরোধী তুমুল আন্দোলন। কাজী নজরুল ইসলাম ‘সাপ্তাহিক ধূমকেতু’ পত্রিকায় লিখতে লাগলেন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে। অন্যায়, অবিচার, অসাম্য ও অসত্যের বিরুদ্ধে তিনি লিখনীয় মাধ্যমে শুরু করলেন প্রচন্ড বিদ্রোহ। তিনি মুসলিম জাতিকে তাদের অতীতের ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে শুনিয়েছেন জাগরণের বাণী। তিনি স্বদেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছেন পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে দেয়ার জন্যে। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্ণওয়ালিশের প্রবর্তিত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে’র মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠী এ দেশের বিশেষ করে মুসলমান কৃষকদের ক্রমান্বয়ে নিঃস্ব করে ফেলেছিল। মুসলমান কৃষকরা তাঁদের জায়গা জমি ও বাড়ী-ঘর সব কিছু হারিয়ে প্রায় পথে বসেছিল। কবি কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক চক্রের বিরুদ্ধে এ দেশের কৃষক সমাজকে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানান। তিনি ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থের ‘কৃষাণের গান’ নামক কবিতায় লিখেছেন-
চল্ চল্ চল্!
ঊর্ধ্ব গগণে বাজে মাদল,
নিম্নে উতলা ধরণী-তল,
অরুণ পাতে তরুণ দল
চল্-রে চল্-রে চল।
চল্ চল্ চল্ ।।
কবি কাজী নজরুল ইসলাম বহু হামদ, নাত , গজল, আধুনিক গান, ইসলামী গান , গল্প, কবিতা, সাহিত্য ও উপন্যাস  রচনা করে যান। এ সকল বিষয়ে তাঁর রচনার সংখ্যা কয়েক সহস্র। তাঁর রচনাবলীর মধ্যে অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশী, দোলন চাঁপা চক্রান্ত, প্রলয় শিখা, ভাঙ্গার গান, নতুন চাঁদ, ফনীমনসা, রিক্তের বেদন, মৃত্যুক্ষুধা, সাম্যবাদী, সর্বহারা, সিন্দু ‍হিন্দোল, রাজবন্দীর জবানবন্দী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে ‘নজরুল ইনস্টিটিউট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তাঁর লেখার উপর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি ফারসী ভাষার মহাকবি হাফিজের কতকগুলো কবিতার বাংলা অনুবাদ করেছেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের অধিকাংশ কবিতা ও সাহিত্য রুশ ভাষাতে অনুদিত হয়েছে। ইংরেজী ভাষায়ও তাঁর লেখার অনুবাদ হয়েছে এবং হচ্ছে। ১৯৪৫ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কবি জগত্তারিণী পুরস্কার প্রাপ্ত হন। ১৯৬০ সালে তিনি ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৭০ সালে বিশ্ব ভারতী কবিকে ‘ডিলিট’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করে। ১৯৭৩ সারে কবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ‘ডিলিট’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন। ১৯৭৫ সালে কবিকে ‘একুশে পদক’ প্রদান করা হয়।


আধুনিক বাংলা কাব্য ও সাহিত্যে মুসলিম সাধনার সবচেয়ে বড় প্রেরণা হলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর আবির্ভাবে মুসলিশ স্বতন্ত্র কাব্য সাধনার দিগন্তে নবোদিত সূর্যের মহিমা বিচ্ছুরিত হয়েছে। ইসলামী বিভিন্ন বিষয়গুলোকে তিনিই প্রথমবার সত্যিকার সাহিত্যে রূপ দিয়েছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়াও প্রবীণদের মধ্যে মীর মোশাররফ হোসেন, মহাকবি কায়কোবাদ, কবি গোলাম মোস্তফা, ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং নবীণদের মধ্যে কবি ফররুখ আহমেদ, সৈয়দ আলী আহসান তালিম হোসেন, কাদির নেওয়াজ প্রমুখ কবিগণ মুসলিম স্বাতন্ত্রবোধের বাণী উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু সে বাণী নজরুল ইসলামের ন্যায় বজ্রকণ্ঠ ছিল না, ছিল অর্ধোচ্চারিত। নজরুল কাব্যে ইসলামী ও মুসলিম ঐতিহ্য বলিষ্ঠ ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। নজরুল ছিলেন মুসলিম পুনর্জাগরণের কবি এবং স্বাধীনতা চেতনার প্রতীক। বাংলা ভাষায় আরবী, ফারসী শব্দের সার্থক ব্যবহার, ইসলামী আদর্শ এবং স্বাধীনতা চেতনার প্রতীক। বাংলা ভাষায় আরবী, ফারসী শব্দের সার্থক ব্যবহার , ইসলামী আদর্শ এবং মুসলিম ঐতিহ্যের রুপায়নে নজরুল ইসলামের অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি ‘খেয়াপারের তরণী’ কবিতায় লিখেছেন-
‘আবু বকর, উসমান, উমর আলী হারদার,
দাঁড়ী যে এ তরণীর, নাই ওরে নাই ডর।
কান্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি-মাল্লা,
দাঁড়ী মুখে সারী গান-লা শরীক আল্লাহ।’
কারবালার মর্মান্তিক বিয়োগান্ত ঘটনা কবি কাজী নজরুল ইসলাম কি সুন্দর ভাবে তাঁর কাব্যে ফুটিয়ে তুলেছেন-
‘নীল সিরা আসমান লালে লাল দুনিয়া,
আম্মা! লাল তেরি খুনকিয়া খনিয়া।
কাঁদে কোন্ ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে
সে কাঁদনে আসু আনে সীমারের ছোরাতে।’
ইসলামী আদর্শ ও মুসলিম জাতির স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন-
‘ধর্মের পথে শহীদ যাহারা, আমরা সেই সে জাতি।
সাম্য মৈত্রী এনেছি আমরা বিশ্বের করেছি জ্ঞাতি।
আমরা সেই সে জাতি’।।
কাজী নজরুল ইসলামের আল্লাহর প্রতি ছিল অগাধ ভক্তি ও বিশ্বাস। মানুষের প্রতি আল্লাহ পাকের অশেষ নেয়ামতের শুকরিয়া জ্ঞাপন করে তিনি লিখেছেন-
এই সুন্দর ফুল সুন্দর ফল মিঠা নদীর পানি
খোদা তোমার মেহের বাণী।।
এই শস্য-শ্যামল ফসল ভরা মাটির ডালি খানি
খোদা তোমার মেহের বাণী।।
তুমি কতই দিলে মানিক রতন, ভাই বেরাদার পুত্র স্বজন
ক্ষুধা পেলে অন্ন জোগাও মানি না মানি
খোদা তোমার মেহের বাণী।।
তিনি ইসলামের মৌলিক ইবাদত ও বিধানকেও বাংলা কাব্যে যথাযথভাবে প্রয়োগ করেছেন। তিনি লিখেছেন-
‘মসজিদে ঐ শোন রে আযান, চল্ নামাযে চল,
দুঃখে পাবি সান্ত্বনা তুই বক্ষে পাবি বল।
ওরে চল্ নামাযে চল্।
…………………………………………………………..
“তুই হাজার কাজের অছিলাতে নামায করিস কাজা,
খাজনা তারি দিলি না, যে দিন দুনিয়াতে রাজা।
তারে পাঁচ বার তুই করবি মনে, তাতেও এত ছল
ওর চল, নামাযে চল।”
এমনিভাবে কবি নজরুল ইসলাম তাঁর কাব্যে মুসলিম স্বাতন্ত্রবোধ সৃষ্টি করেছেন। তাঁর প্রতিটি ইসলামী গান, গজল, হামদ ও নাত প্রায় প্রত্যেক বাঙালী মুসলমানের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ওয়াজ মাহফিল ও মিলাদ মাহফিলে তাঁর লেখা হামদ, নাত ও গজল পঠিত হচ্ছে।


১৯৪২ সালে কবি কাজী নজরুল ইসলাম এক দূরূহ ব্যধিতে আক্রান্ত হন এবং বাকশক্তি চিরদিনের জন্যে হারিয়ে ফেলেন। তাঁকে সুস্থ করে তোলার জন্যে দেশের সকল প্রকার চিকিৎসা ব্যর্থ হবার পর ১৯৫৩ সালে সুচিকিৎসার জন্যে সরকারী ব্যবস্থাধীনে লন্ডনে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানেও কবিকে রোগমুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
তারপর ১৯৭২ সালে তাঁকে বিদেশ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় নিয়ে আসা হয় এবং ঢাকার পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর বাংলা ১৩৮৩ সালের ১২ই ভাদ্র মোতাবেক ১৯৭৬ইং সালের ২৯শে আগস্ট এ বিখ্যাত মনীষী পিজি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তাঁর একটি ইসলামী সংগীতে অছিয়ত করে যান, তাঁকে মজিদের পার্শ্বে কবর দেয়ার জন্যে; যেন তিনি কবরে শুয়েও মুয়াজ্জিনের সুমধুর আযানের ধ্বনি শুনতে পান। তিনি লিখেছেন-
মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই।
যেন গোরে থেকেও মুয়াজ্জিদের আযান শুনতে পাই
……………………………………………………………….
আমার গোরের পাশ দিয়ে ভাই নামাযীরা যাবে,
পবিত্র সেই পায়ের ধ্বনি এ বান্দা শুনতে পাবে।
গোর-আযাব থেকে এ গুণাহগার পাইবে রেহাই
তাঁর সে অছিয়ত অনুয়ায়ীই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন উত্তর পার্শ্বে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবিকে সমাহিত করা হয়। মসজিদের পার্শ্বে কবি আজ চির নিদ্রায় শায়িত। প্রতিদিন প্রায় অসংখ্য মানুষ নামাজান্তে কবির মাজার জিয়ারত করছে। আজ কবি পৃথিবীতে নেই; কিন্তু বাংলা কাব্যে কবি ইসলামী ভাবধারা ও মুসলিম স্বতন্ত্রবোধ সৃষ্টিতে যে অবদান রেখে গেছেন, প্রতিটি শিক্ষিত বাঙালী মুসলমানের হৃদয়ে কবি অমর হয়ে থাকবেন।

সত্যজিৎ রায়
[১৯২১-১৯৯২]

বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে বাস করে সত্যজিৎ রায়ের ছবি না দেখে চন্দ্র-সূর্য না দেখার মতই অদ্ভুত ঘটনা।” রবীন্দ্রনাথের পর বাংলার সাংস্কৃতিক জগতের অপর কেউই বিশ্বের দরবারে এতখানি সম্মান পাননি। ভারতীয় চলচ্চিত্রকে তিনি শুধু যে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাই নয়, তাকে এক মহত্তর সৌন্দর্যে উত্তরণ ঘটিয়েছেন।


বিরল প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটির জন্ম ১৯২১ সালের ২রা মে। কৃতী বংশের যোগ্য উত্তরপুরুষ। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একমাত্র ঠাকুর পরিবারের সঙ্গেই এই পরিবারের তুলনা করা যায়।সত্যজিতের পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন বাংলা শিশু সাহিত্যের অন্যতম স্রষ্টা। সাহিত্য ছাড়াও বাংলা ছাপখানার উন্নতির ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিরাট। ১৯০০ সালে তিনি সুকিয়া স্ট্রীটের বাড়িতে ইউ রায় অ্যান্ড সন্স নামে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত করেন। এখান থেকে বহু বই প্রকাশিত হয়েছিল।
উপেন্দ্রিকিশোরের বড় ভাই সারদারঞ্জন ছিলেন পন্ডিত মানুষ আর ক্রিকেটের ভক্ত। আরেক ভাই কুলদারঞ্জনও ছিলেন সাহিত্যিক। তাঁর কন্যা বিখ্যাত সাহিত্যিক লীলা মজুমদার। উপেন্দ্রকিশোরের পুত্র সুকুমার রায়ের জন্ম ১৮৮৭ সালে। মাত্র আট বছর বয়স থেকেই শুরু হয়। তাঁর ছবি আঁকা, কবিতা লেখা। ১৯১৩ সালে উপেন্দ্রকিশোর সন্দেশ পত্রিকা চালু করবার পর সুকুমার সেখানে নিয়মিত লিখতেন। ১৯১৪ সালে সুকুমারের বিয়ে হল ঢাকার বিখ্যাত সমাজসেবক কালীনারায়ণ গুপ্তের নাতনি সুপ্রভার সাথে। বিবাহের ৭ বছর পর জন্ম হয় সত্যজিতের। ১৯২৩ সাল, সত্যজিৎ তখন দু বছরের শিশু, কয়েকদিনের জ্বরে মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে মারা গেলেন সুকুমার। এই স্বল্প জীবনকালেই তিনি রচনা করেছেন আবোল তাবোল, হ-য-ব-র-ল, পাগলা পশুর মত অসাধারণ শিশু সাহিত্য।


১৯৪৮ সালে সত্যজিৎ তাঁর মায়ের বৈমাত্রেয় ভাই চারুচন্দের ছোট মেয়ে বিজয়াকে বিয়ে করলেন। দুজনেই পরস্পরকে ভালবাসতেন। শুধুমাত্র পুত্রের সুখের কথা ভেবে সুপ্রভা দেবী এই বিবাহে মত দিলেন। চাকরিসূত্রে কয়েক মাসের জন্য ইংল্যান্ডে গেলেন সত্যজিৎ। এই সময় তিনি ইউরোপ-আমেরিকার শ্রেষ্ঠ পরিচালকদের অসংখ্য ছবি দেখতেন। যা দেখতেন গভীরভাবে অনুভব করবার চেষ্টা করতেন। ভারতে ফিরে এসে স্থির করলেন পথের পাঁচালী ছবি করবেন।


সত্যজিতের মায়ের এক বন্ধুর সাথে বিধান রায়ের পরিচয় ছিল। সেই সূত্রেই সত্যজিৎ তাঁকে পথের পাঁচালীর কিছুটা অংশ দেখালেন। পথের পাঁচালী বিধান রায়ের ভাল লেগেছিল। তিনি দশ হাজার টাকার সরকারী অনুদান দিলেন। আমেরিকা থেকে এসেছিলেন মনরো হুইলার। পথের পাঁচালীর অর্ধেক দেখেই তিনি মুগ্ধ হলেন। ১৯৫৫ সালের এপ্রিল মাসে নিউইয়র্কে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। তিনি সেখানে পাঁচালীকে পাঠাবার জন্যে অনুরোধ করলেন। সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত ছবি শেষ হল। বাক্সবন্দী পথের পাঁচালী ছবি পাঠানো হল আমেরিকায়। ১৯৫৫ সালে পথের পাঁচালী কলকাতার বসুশ্রী সিনেমা হলে মুক্তি পেল। প্রযোজক পশ্চিমবঙ্গ সরকার। প্রথম দিকে দর্শকরা এই ছবিটিকে গ্রহণ করতে না পারলেও কয়েক সপ্তাহ পর থেকে চারদিকে সত্যজিতের প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ল। জনসাধারণের ভিড় বাড়তে থাকে। এর মূলে ছিল পথের পাঁচালীর অসাধারণত্ব। বিভূতিভূষণের উপন্যাসের মূল সুরটিকে এক আশ্চর্য দক্ষতায় ছবির পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন সত্যজিৎ। প্রত্যেকের অভিনয় ছিল জীবন্ত আর সজীব। এর সাথে ছিল রবিশঙ্করের অসাধারণ সংগীত। তিনিই প্রথম দেখালেন চলচ্চিত্রে সংগীতের কত সার্থক প্রয়োগ ঘটানো সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে পথের পাঁচালীর মধ্যে দিয়ে সত্যজিৎ চলচ্চিত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন।
১৯৫৬ সালে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কার পেল পথের পাঁচালী। তারপর দেশে-বিদেশে একের পর এক পুরস্কার। এক অখ্যাত বাঙালী তরুণ শুধুমাত্র একটি ছবি করেই জগৎবিখ্যাত হয়ে গেলেন। পথের পাঁচালী শুধু একটি ছবি নয়, গভীর প্রশান্ত সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত এক তুলনাহীন সৃষ্টি-যা দেশকাল উত্তীর্ণ হয়ে মানুষকে অভিভূত করে। সেই কারণেই জহরলাল বলেছিলেন, “সত্যজিৎ রায় আর তাঁর ছবি পথের পাঁচালী আমাদের গর্ব।”
পথের পাঁচালীর সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে সত্যজিৎ তৈরি করলেন অপরাজিতা। অপু ট্রিলজির দ্বিতীয় ছবি। অপুর কৈশোর জীবনের কাহিনী। অপরাজিতা সাধারণ দর্শকরা গ্রহণ করতে না পারলেও ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পেল শ্রেষ্ঠ পুবস্কার গোল্ডেন লায়ন।
এর পর সত্যজিৎ তৈরি করলেন অপু ট্রিলজির শেষ ছবি অপুর সংসার। এই ছবিতে নিয়ে এলেন তরুণ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর চৌদ্দ বছরের কিশোরী শর্মিলা ঠাকুরকে। লন্ডন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অপুর সংসারকে দেওয়া হল শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। বিশ্বের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এই ট্রিলজির কোন তুলনা নেই। মহান সাহিত্যস্রস্টাদের সৃষ্টির সাথেই এর তুলনা করা যায়। অপরাজিতা ছবি মুক্তি পায় ১৯৫৬ সালে। এই ছবি ব্যবসায়িক সাফল্য না পাওয়ার জন্য সত্যজিৎ অপুর সংসারের আগে দুটি ছোট ছবি তৈরি করেন পরশ পাথর (১৯৫৭) আর জলসাঘর (১৯৫৮)। জলসাঘর তারাশঙ্করের একটি ছোট গল্প। দুটি ছবিতেই সত্যজিতের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছে।


এরপর দেবী। হিন্দুদের প্রচলিত বিশ্বাস আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র আঘাত হানলেন সত্যজিৎ। এক শ্রেণীর মানুষ এই ছবির মুক্তির ব্যাপারে তীব্র বিরোধিতা প্রকাশ করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত জহরলালের হস্তক্ষেপে এই ছবি মুক্তি পেল। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক  রর্বাট স্টীল লিখেছেন, সত্যজিৎ রায় তাঁর সিনেমার জীবন শুরুই করেছেন মাস্টারপীস ছবি দিয়ে। যদি অপু সৃষ্টি না হত তবে দেবীকে সেই সম্মান দেওয়া হত। দেবী সত্যজিতের সবচেয়ে প্রাঞ্জল আর সরল ছবি। এর মধ্যে আছে এক আবেগের গভীরতা আর সৌন্দর্য যা তুলনাহীন।
রবীন্দ্রকাব্য সত্যজিৎকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছিল। রবীন্দ্রনাথের তিনটি ছোট গল্প অবলম্বনে তৈরি করলেন তিন কন্যা (১৯৬১)-মণিহারা, পোস্টমাস্টার আর সমাপ্তি। মেলবোর্ন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে শ্রেষ্ঠ ছবির পুরুস্কার পেল তিন কন্যা। সমাপ্তি গল্পেই প্রথম অভিনয় করলেন কিশোরী অপর্ণা। এর পর একে একে মুক্তি পেতে থাকে কাঞ্চনজঙ্ঘা (১৯৬২), অভিযান (১৯৬২), মহানগর (১৯৬৩), চারুলতা (১৯৬৪), কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫), নায়ক (১৯৬৬)। নায়ক সত্যজিত্যের এক সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ছবি। এক বিখ্যাত অভিনেতার জীবন যন্ত্রণার কাহিনী।
পথের পাঁচালীর পর গ্রাম্যজীবন নিয়ে দ্বিতীয় ছবি করেন বিভূতিভূষণের কাহিনী অবলম্বন করে অশনি সংকেত (১৯৭৩)। ৪৩-এর মন্বন্তর কিভাবে গ্রামের সহজ সরল জীবনকে ধ্বংস করে নিয়ে এল দুর্ভিক্ষ, মহামারী আর ব্যভিচার, তারই এক জীবন্ত চিত্র। এই ছবির কোন চরিত্রকেই মনে হয়নি তারা অভিনয় করছে। সকলেই যেন জীবনের পাতা থেকে উঠে এসেছে। দুর্ভিক্ষের উপর এমন ছবি বিশ্বে খুবই তৈরি হয়েছিল। বার্লিন, শিকাগো দুটি চলচ্চিত্র উৎসবেই অশনি সংকেত পেয়েছিল সর্বশ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কার। মুন্সী প্রেমচাঁদের কাহিনী অবলম্বন করে প্রথম হিন্দী ছবি করলেন শতরঞ্জ কে খিলাড়ী। দুই বিরাসী ওমরাহ সমাজ সংসার ভুলে দাবা খেলায় মত্ত হয়ে থাকে। অন্যদিকে ইংরেজরা রাজনৈতিক চালে এক একটি রাজ্য দখল করতে থাকে। নিতান্ত সাধারণ কাহিনী, ঘটনার ঘনঘটা নেই। কিন্তু প্রতিভার স্পর্শে অসাধারণ ছবি হয়ে উঠেছে শতরঞ্জ কে খিলাড়ী। সত্যজিতের ছবির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল অতি সামান্য বিষয়ও যাতে নিখুঁত হয় সেদিকে ছিল তাঁর সতর্ক দৃষ্টি। সেই কারণে স্যার রিচার্ড অ্যাটনবরো বলেছিলেন, “সত্যজিতের যে জিনিসটি আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিল তা প্রতিটি বিষয়ের প্রতি তাঁর তীক্ষ্ন দৃষ্টি। একমাত্র চ্যাপলিন ছাড়া আর কোন পরিচালকের সত্যজিতের মত সিনেমা পরিচালনার ব্যাপারে সকল বিষয়ে প্রতিভা আছে কিনা সন্দেহ।”
নিজেরই কাহিনী অবলম্বন করে সত্যজিৎ তৈরি করেছিলেন দুটি গোয়েন্দা ছবি সোনারকেল্লা আর জয় বাবা ফেলুনাথ। ‍নিছক গোয়েন্দা লোমহর্ষক ঘটনার মধ্যে তিনি কাহিনীকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। মনোমুগ্ধকর অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্যের সাথে যুক্ত করেছিলেন হাসি আর হেঁয়ালি। ছোটদের জন্যে এত সুন্দর গোয়েন্দা কাহিনী খুব কমই তৈরি হয়েছে।
সত্যজিৎ যখন ডি. জে. কীমারে চাকরি করতেন তখনই তাঁর মনে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের “ঘরে বাইরে” অবলম্বনে ছবি করবেন। কিন্তু সেই সময় তাঁর ইচ্ছা পূর্ণ হয়নি। অবশেষে ১৯৪৮ সালে তৈরি করলেন ঘরে বাইরে। রবীন্দ্র রচনার মূল সুরটিকে এত নিপুণভাবে সত্যজিৎ তাঁর ছবিতে তুলে ধরেছেন যা আর কোন পরিচালকের পক্ষেই সম্ভব হয়নি। ক্রমশই তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছিল। ঘরে বাইরের পর বেশ কয়েক বছর কোন ছবি করেননি। ১৯৮৯ সালে ইবসেনের কাহিনী অবলম্বনের তৈরি করেছিলেন গণশত্রু (১৯৮৯), তারপর শাখা-প্রশাখা (১৯৯০), শেষ ছবি আগন্তুক (১৯৯১)।


চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবে সত্যজিতের স্থান পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কয়েকজন পরিচালকের মধ্যে। তাঁর ছবিতে গভীর সূক্ষ্ম অনুভূতি, নান্দনিক সৌন্দর্য, জীবনের ব্যাপ্তি, বিষয়বস্তুর প্রতি নিষ্ঠার প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায় তা তুলনাহীন। তাঁর ছবি যেন সংগীত, শ্রেষ্ঠ কবির কবিতা। যতবার দেখা যায় ততবারই উন্মোচন হয় নতুন সৌন্দর্য,মনের জগতে উন্মোচিত করে এক নতুন সৌন্দর্য, মনের জগতে উন্মোচিত করে এক নতুন দিগন্ত। যার মধ্যে আমরা আমাদেরই খুঁকে পাই।
চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিতের খ্যাতি জগৎ জোড়া হলেও সাহিত্যস্রষ্টা হিসাবে তাঁর খ্যাতি কিছুমাত্র কম নয়। তাঁর পিতা-পিতামহের ঐতিহ্য অনুসরণে তিনিও নানান বিষয় নিয়ে লিখতেন। তাঁদের পারিবারিক পত্রিকা চালু হল। এই পত্রিকার জন্য নিজেই কলম ধরলেন সত্যজিৎ। নিজে ছোট ছোট ছড়া লিখতেন। এবার লিখলেন ধারাবাহিক বিজ্ঞানভিত্তিক উপন্যাস প্রফেসর শঙ্কু। পরবর্তীকালে প্রফেসর শঙ্কুকে নিয়ে আরো কয়েকটি বই লিখেছেন। তবে সত্যজিতে আসল খ্যাতি তাঁর ফেলুদাকে নিয়ে। শিশু-কিশোরদের কাছে ফেলুদার আকর্ষণ অতুলনীয়। গোয়েন্দা গল্পের গোয়েন্দা ফেলুদা তার স্রষ্টার মতই বিখ্যাত। সত্যজিতের গল্প বলার ভঙ্গি অসাধারণ। সহজ সরল ভাষা, কাহিনীর নিটোল বুনন, অপূর্ব বর্ণনা, টানটান উত্তেজনা পাঠককে শেষ পর্যন্ত মুগ্ধ করে রাখে। তাঁর রচনা, চিরায়ত সাহিত্যের পর্যায়ে না পড়লেও দীর্ঘ দিন পর্যন্ত পাঠকের মনোরঞ্জন করতে পারবে, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
ফেলুদা শঙ্কু ছাড়াও সত্যজিৎ বেশ কিছু ছোট গল্প লিখেছেন, যেমন এক ডজন গপ্পো, আরো এক ডজন, আরো বারো-এই বইগুলির প্রতিটি গল্পই যেমন উপভোগ্য তেমনি সার্থক সৃষ্টি।
চলচ্চিত্র নিয়ে তাঁর প্রথম ইংরেজি বই “Our Films their Films” বিশ্ব চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে এক মূল্যবান সংযোজন। এতে একদিকে যেমন ফুটে উঠেছে তাঁর সহজাত রসবোধ, অন্যদিকে গভীর পান্ডিত্য। তাঁর আত্মজীবনী “যখন ছোট ছিলাম” খুবই উপভোগ্য। বিরাট প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি চিত্রশিল্পী হিসাবেও ছিলেন অসাধারণ। নিজের  বইয়ের সমস্ত ছবি নিজেই আঁকতেন। এছাড়া বহু বিখ্যাত বইয়ের প্রচ্ছেদ তাঁরই  আঁকা। অসামান্য কীর্তির জন্য অসংখ্য পুরুস্কার পেয়েছেন সত্যজিৎ। পথের পাঁচালী দিয়ে ১৯৫৬ সালে পান প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কার আর তার পরিসমাপ্তি ঘটে ৩০শে মার্চ ১৯৯২ অস্কার পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে। এর মাঝে তিনি দেশে-বিদেশে অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন, নানাভাবে সম্মানিত হয়েছেন। শ্রেষ্ঠ পরিচালনা, শ্রেষ্ঠ ছবির জন্য পুরস্কারের কথা বাদ দিলেও নানান বিশ্ববিদ্যালয়। শান্তিনিকেতন থেকে পেয়েছেন দেশিকোত্তম। ১৯৮৫ সালে পেয়েছেন দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার।
১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ফরাসী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিঁতের কলকাতায় এসে সত্যজিৎকে দিলেন সে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান “লিজিয়ন অফ অনার”। এ এক দুর্লভ সম্মান জানিয়ে ফরাসী প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, “ ভারতের সাংস্কৃতিক জগতে সত্যজিৎ রায় এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। চলচ্চিত্র জগতে এই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ পুরুষ। তাঁর মতো এক মহান ব্যক্তিকে আমাদের দেশের সর্বোচ্চ সম্মান  জানাতে পেরে আমি ও আমার দেশবাসী আজ কৃতজ্ঞ বো্ধ করছি। জীবনের অন্তিম পর্বে এল ইলিউডের সর্বোচ্চ সম্মান অস্কার। যা পৃথিবীর সব চলচ্চিত্র নির্মাতার কাছে চির আকাঙ্ক্ষিত বস্তু। তাঁকে এই পুরস্কার দেবার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন বিখ্যাত ৭০ জন মানুষ। এঁদের মধ্যে ছিলেন মূল্যায়ন করে তাঁকে দেওয়া হয় সাম্মানিক অস্কার। তাঁর আগে মাত্র পাঁচজনকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়-গ্রেটা গার্বো (১৯৫৫), ক্যারি গ্রান্ট (১৯৬৯), চার্লি চ্যাপলিন (১৯৭২), জেমস স্টুয়ার্ট (১৯৮৪), কুরোসাওয়া (১৯৮৯)।
যখন অস্কার পুরস্কারের কথা ঘোষণা করা হল, সত্যজিৎ তখন অসুস্থ। বিছানায় শয্যাশায়ী। তিনি বলেছিলেন, “অস্কার পাওয়ার পর আমার পাওয়ার আর কিছুই রইল না।”
জীবনের সব পাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই পুরস্কার পাওয়ার মাত্র তেইশ দিন পর এই পার্থিব জীবন থেকে চিরচিদায় নিলেন সত্যজিৎ (২৩শে এপ্রিল ১৯৯২)।

মার্টিন লুথার কিং
[১৯২৯-১৯৬৮]

“আমেরিকার এই গান্ধী আবির্ভূত হয়েছিলেন এক শ্রান্ত মায়ের ক্লান্ত পা দুখানির দিকে তাকিয়ে।”১৯৫৫ সালের ১লা ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার আমেরিকার মন্টগোমারি শহরের সিটি লাইন্সের বাস চলেছে। বাসের সব আসন পূর্ণ। সামনের দিকে বারোজন শ্বেতাঙ্গ, পেছনে চব্বিশজন নিগ্রো। মার্কিন দেশের দক্ষিণের অধিকাংশ রাজ্যেই বাসের সামনের দিকে বসবার অধিকার নেই নিগ্রোদের। সমস্ত বাসই সংরক্ষিত থাকে শ্বেতাঙ্গদের জন্য।
কলেজ থেকে পাশ করবার পর ১৯৪৮ সালে ১৯ বছর বয়সে আমেরিকার পেনসিলভেনিয়ার ক্রোজার থিওলজিক্যাল সেমিনারিতে ভর্তি হলেন। এ এক ভিন্ন পরিবেশ।
এখানে শ্বেতাঙ্গ ও নিগ্রো ছাত্ররা একই সাথে পড়াশুনা করত, কোন বর্ণবৈষম্য ছিল না। পড়াশুনায় বরাবরই মনোযোগী ছাত্র ছিলেন কিং। এখানে ধর্মীয় পাঠ্যপুস্তকের সাথে দেশ-বিদেশের দার্শনিকদের রচনাবলী পড়তে আরম্ভ করলেন। পড়লেন বিভিন্ন দেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস। তবে যাঁর জীবন রচনা তাঁর মনকে অধিকার করে নিল তিনি ভারতের মহাত্মা গান্ধী। তিনি বলতেন, নাজারেথের যীশু আর ভারতের গান্ধী আমার জীবনসর্বস্ব। যীশু পথ দেখিয়েছেন, গান্ধী প্রমাণ করেছেন সেই পথ পাঠ আমি পেয়েছিলাম বাইবেল ও খ্রীস্টের জীবন আর উপদেশের মধ্যে। আর এই প্রতিরোধের পদ্ধতিটি পেয়েছিলেন গান্ধীর কাছ থেকে। ক্রোজার থিওলজিক্যাল সেমিনারি থেকে স্নাতক হওয়ার পথ তিনি বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধর্মতত্ত্বে ডক্টরেট ডিগ্রি পান। ডিগ্রি ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় তাঁর জীবনে আরো একটি প্রাপ্তি ঘটেছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের ছাত্রী ছিলেন কোরেত্তা স্কট নামে একটি তরুণী। কিং- এর সাথে প্রথম পরিচয়ে মুগ্ধ স্কট। অল্পদিনের মধ্যেই দুজনে পরস্পরের আবদ্ধ হলেন। ১৯৫৫ সালে তিনি ডেক্সর্টার এ্যাভিনিউয়ের ব্যাপটিস্ট চার্চের যাজক ‍হিসাবে যোগদান করলেন।


ছাত্র অবস্থা থেকেই নিগ্রো আন্দোলনের প্রতি প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল। ধর্মযাজক হিসাবে যোগদান করবার পর থেকে তিনি সরাসরি এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়লেন। সেই সময় নিগ্রোদের প্রধান সংগঠন ছিল National Association for the Advancement of Coloured People (N A A C P)। এই সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কিং-এর দাদু। সেই সূত্রে এবং নিজের ব্যক্তিত্বের অল্পদিনের মধ্যেই এই এ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন কিং।
১৯৫৫ সালে মন্টগোমারিতে শুরু হল ঐতিহাসিক বাস ধর্মঘট। সমস্ত নিগ্রোদের তরফে দাবি তোলা হল (১) বাসে নিগ্রো ও শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে যে বৈষম্য আছে যে প্রত্যাহার করতে হবে,(২) বাসে যে আগে উঠবে সে আগে বসবে, (৩) নিগ্রোদের সাথে ভদ্র ব্যবহার করতে হবে, (৪) নিগ্রো এলাকা দিয়ে যে সব বাস চলাচল করে সেই সব বাসের ক্ষেত্রে নিগ্রো ড্রাইভার নিযুক্ত করতে হবে।
নিগ্রোদের সমর্থনে এগিয়ে এলেন নিগ্রো খ্রীস্টান ধর্মযাজকরা। প্রতিষ্ঠা হল মন্টগোমারি ইমপ্রুভমেন্ট এ্যাসোসিয়েশন। মার্টিন লুথার কিংও এর সভাপতি নির্বাচিত হলেন। তিনি এক প্রকাশ্য সমাবেশে সমস্ত নিগ্রোদের উদ্দেশ্যে বললেন যতদিন না মন্টগোমারি বাস কোম্পানির পক্ষ থেকে আমাদের দাবি না মেনে নেওয়া হচ্ছে ততদিন একটি নিগ্রোও বাসে উঠবে না।
প্রায় এক বছর নানান প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিগ্রোরা সমস্ত সরকারী বাস বয়কট করে। কর্তৃপক্ষ বিরাট ক্ষতির মুখোমুখি হয়ে শেষ পর্যন্ত নিগ্রোদের সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য হলেন। সুপ্রীম কোর্ট বাসের এই বর্ণবিদ্বেষী ব্যবস্থাকে সংবিধান বিরোধী বলে ঘোষণা করল। অবশেষে M I A-এ সমস্ত দাবি মেনে নেওয়া হল। বাসে নিগ্রোদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হল।
এই জয়ের পেছনে কিং-এর অবদান ছিল বিরাট। তিনি নিগ্রোদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে তাদের সাহস দিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে শ্বেতাঙ্গরা সোচ্চার হয়ে ওঠে। তাঁকে নানাভাবে ভয় দেখানো হতে থাকে। এমনকি একদিন তাঁর বাড়িতে বোমা ফেলা হল। কিন্তু কোন কিছুর কাছেই মাথা নত করলেন না কিং। পুলিশ নানাভাবে তাঁকে বিব্রত করতে থাকে। এমনকি তিনি নিগ্রোদের সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছেন বলে তাঁকে গ্রেফতার করা হল। কিন্তু প্রমাণের অভাবে তাঁকে আদালত থেকে ছেড়ে দেওয়া হল। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি নিগ্রোদের কাছে হয়ে উঠলেন প্রতিবাদের মূর্ত প্রতীক। তিনি বিশ্বাস করতেন শাস্তি আর অহিংসায়। তিনি অন্তরে অনুভব করতেন ন্যায় ও সত্যের সপক্ষে যে সংগ্রাম আরম্ভ করেছেন তা ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই করছেন। শ্বেতাঙ্গরা তাঁকে বিদ্রূপ করে বলত নিগ্রো ধর্মগুরু।
মন্টগোমারির বাস আন্দোলনে এই গৌরব-উজ্জ্বল ভূমিকায় কি-এর নাম ছড়িয়ে পড়ল সমস্ত আমেরিকায়। তাঁর এই অহিংস আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাতো এগিয়ে এল বহু নিগ্রো নেতা। সমস্ত আমেরিকা জুড়েই বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জেগে উঠতে থাকে।
১৯৫৭ সালে আমেরিকার বিভিন্ন প্রদেশের নিগ্রো নেতৃবৃন্দ এবং তাছাড়া বিভিন্ন প্রাদেশিক সরকারের নিগ্রো মন্ত্রীরা মিলিত হলেই আটলান্টা শহরে। নিগ্রোদের সামাজিক ও আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিকে আরো জোরদার করবার জন্য প্রতিষ্ঠিত হল Southern Christian Leadership Conference. সংক্ষেপে বলা হল S.C.L.C.। মার্টিন লুথার ও আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। এখানে দুই নেতার মধ্যে সাক্ষাৎ হল। নিক্সন নিগ্রোদের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। এক বছর পর রাষ্ট্রপতি আইজেনহাওয়ারের আমন্ত্রণে হোয়াইট হাউসে মিলিত হলেন কিং  অন্যসব নিগ্রো নেতারা। বেশ কয়েকবার আলোচনা বৈঠক বসবার পরেও কোন সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভবপর হল না। সরকারের অধিকাংশ প্রস্তাবই তাঁদের সপক্ষে মনোমত হল না। কি-এর ভাষায় This is no real or meaningful settlement.
দেশের মধ্যে শ্বেতাঙ্গদ আচরণে ক্রমশই বর্ণবিদ্বেষী মনোভাব প্রকট হয়ে উঠেছিল। শুধুমাত্র সামাজিক ক্ষেত্রে নয়, আইনগত ক্ষেত্রেও নানাভাবে নিগ্রোদের বঞ্চনা করা হত। বহু রাজ্যে নিগ্রোদের কোন ভোটাধিকার ছিল না। সরকারী উচ্চপদে বসবার অধিকার ছিল না নিগ্রোদের। কিং আমেরিকার প্রান্তে প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়ে প্রচার করতে লাগলেন, এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে অহিংসা আন্দোলনে যোগ দেবার জন্য সমস্ত নিগ্রোদের কাছে আহ্বান জানাতে থাকেন। ধীরে ধীরে প্রায় প্রতিটি প্রদেশেই আন্দোলন সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে উঠতে থাকে। কিং হয়ে উঠলেন সমস্ত আমেরিকার নিগ্রো মানুষের অবিসংবাদিত নেতা।
১৯৫৯ সালে প্রধানমন্ত্রী জহরলালের আমন্ত্রণে ভারতবর্ষে এলেন কিং ও তাঁ স্ত্রী। ভারতবর্ষ কিং-এর কাছে ছিল এক মহান দেশ। তিনি মহাত্মা গান্ধীর জন্মস্থানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন।
কিং ভারত ভ্রমণ শেষ করে যখন আমেরিকায় ফিরে এলেন, আমেরিকা জুড়ে আন্দোলন হিংসাত্মক রূপ নিয়েছে। নিগ্রোর শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করলেও শ্বেতাঙ্গরা হিংস্র হয়ে ওঠে। নিগ্রোদের মধ্যে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে। তারাও পালটা আক্রমণ শুরু করে। সর্বত্রই ভাঙচুর লুঠতরাজ গুলি লাঠি চলতে থাকে। কৃষ্ণাঙ্গদের উপর সমস্ত অভিযোগ এসে পড়ে।
১৯৬৫ সালে আমেরিকা ভিয়েৎনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল। শান্তির পূজারী কিং ‍ছিলেন যুদ্ধের বিপক্ষে। ভিয়েৎনামের মত একটি ছোট দেশের উপর আমেরিকার এই আক্রমণকে মেনে নিতে পারলেন না কিং। দেশ জুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিগ্রোদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের উপর শ্বেতাঙ্গরা হিংস্রভাবে আক্রমণ করছিল। নিগ্রোরাও এর বিরুদ্ধে পালটা আক্রমণ শুরু করল। সর্বত্রই অহিংস সত্যাগ্রহ হিংসাত্মক আন্দোলনে পরিণত হল। এতে ব্যথিত হতেন কিং। তিনি বার বার সকলকে শান্ত সংযত থাকবার জন্য আহ্বান জানাতেন। আমেরিকা ক্রমশই ভিয়েৎনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। বিশ্বের বহু বুদ্ধিজীবী মানুষের সাথে কিংও প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধের বিরোধিতা আরম্ভ করলেন। ১৯৬৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৫ তারিখে তিনি ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যে যুদ্ধবিরোধী পদযাত্রা করবার আহ্বান জানালেন আমেরিকার সমস্ত শান্তিকামী মানুষকে। এরই সাথে তিনি ঘোষণা করলেন ২৭শে এপ্রিল দেশ থেকে দারিদ্র্য নির্মূল করবার জন্য আর্থিক নিরাপত্তার দাবিতে দলমত নির্বিশেষে সমস্ত দরিদ্র মানুষদের সাথে নিয়ে তিনি ওয়াশিংটন অভিযান করবেন। শান্তি অভিযানে সেদিন হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে উঠেছিল শান্তির আহ্বান।
মেমপিস টেনেসি রাজ্যে নিগ্রো পৌরকর্মীরা শ্বেতাঙ্গদের সমান মাইনে ও কাজের সুযোগ-সুবিধা বাড়াবার জন্য আন্দোলন করছিল। কিং সেখানে গেলেন। কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারীদের একটি দাবিও মেনে নিলেন না। কিছু অল্পবয়সী ছেলে এর প্রতিবাদে ভাঙচুর শুরু হয়ে গেল। পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন মারা পড়ল।
৩রা এপ্রিল কিংকে হত্যার হুমকি দেওয়া হল। তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে অন্যত্র চলে যেতে বললেন। কিন্তু অকুতোভয় কিং বললেন তাঁর যাই ঘটুক না কেন তিনি এখান থেকে যাবেন না। সকলকে হিংসা ত্যাগ করবার আহ্বান জানালেন। পরদিন তিনি যখন হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, আততায়ীর বন্দুকের গুলিতে আহত হয়ে লুটিয়ে পড়লেন। সন্ধ্যে সাতটায় চিরশান্তির প্রতীক মার্টিন লুথার কিং তার আদর্শ খ্রীস্ট, গান্ধীর মতই হিংস্র মানুষের হিংস্রতার কাছে আত্মাহুতি দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। তখন তিনি ঊনচল্লিশ বছরের এক যুবক।

জর্জ বার্নার্ড শ
[১৮৬৫-১৯৫০]

প্রায় ছ ফুট লম্বা পাতলা চেহারা, পরনে আধময়লা প্যান্ট আর কোট। মাথায় সস্তা দামের টুপি। বাইশ তেইশ বছরের এক তরুণ। হাতে একবান্ডিল কাগজ নিয়ে প্রকাশকের দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়ান। অনেক পরিশ্রম করে একটা উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর মনের ইচ্ছে যদি কেউ তাঁর উপন্যাস প্রকাশ করে। এক একদিন এক একজন প্রকাশকের কাছে যান। তাঁর আসার উদ্দেশ্যের কথা শুনেই অনেকে দরজা থেকেই তাঁকে ফিরিয়ে দেন।
অনেকে দু-চারটে কথা বলেন, উৎসাহ দেন আরো লেখ। ছাপাবার জন্য এত ব্যস্ততা কিসের। কাউকে অনুরোথ করা যেন তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। একদিন একজন পড়বার জন্য রেখে দেয়। আশা নিয়ে বাড়ি ফেরেন তরুণ। দুদিন পরে যেতেই পান্ডুলিপি ফিরিয়ে দেন প্রকাশক। ছাপা হলে একটাও বই বিক্রি হবে হতাশায় ভেঙে পড়েন তরুণ। তাঁর ভাগ্যে লেখক হবার কোন আশা নেই। ছয় বছরে পাঁচখানা উপন্যাস লিখেছেন কিন্তু একটা উপন্যাস ছাপাবার মত প্রকাশক পাওয়া যায়নি। পঞ্চাশজন প্রকাশক তাঁর লেখা পাঠিয়ে দিয়েছে। শেষে এমন অবস্থা হল লেখা পাঠাবার মত হাতে একটি পেনিও নেই। দুঃখে হতাশায় ‍ তিনি ঠিক করলেন, আর যাই করুন না কেন কোন দিন লেখক হবেন না। নিজের প্রতিজ্ঞা রাখতে পারেননি তরুণ। কিছুদিন পরে আবার শুরু করলেন লেখা, তবে এবার আর উপন্যাস নয়-নাটক। আর এই নাটকই তাঁকে এনে দিল বিশ্বজোড়া খ্যাতি। শেকসপীয়রের পরে যাঁকে বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নাট্যকার। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবতার পূজারী-এই মহান মানুষটির নাম জর্জ বার্নার্ড শ।
আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে শ-এর জন্ম। ডাবলিন শহরে পরিবারের ছিল খুবই খ্যাতি আর সম্মান। ১৮৫৬ সালের ২৬শে জুলাই জন্ম হয় বার্নার্ড শ-এর। তাঁরা ছিলেন দুই বোন এক ভাই। বার্নার্ড-এর বাবা ছিলেন জর্জ কার শ। মার নাম লুসিন্দা এলিজাবেথ। বাবা ছিলেন হাসিখুশি প্রাণখোলা মানুষ। এক বন্ধুর সাথে ভাগে ময়দার কারবার ছিল তাঁর। বন্ধুর প্রতারণার কারবার নষ্ট হয়ে গেল। অনেক টাকা ক্ষতি হল। এরপর থেকেই শুরু হল আর্থিক দুরবস্থা। শ-এর মা ছিলেন এক অসাধারণ গুণবতী মহিলা। শ-এর জীবনে মায়ের ভূমিকা বিশাল। তাঁর বড় হয়ে ওঠার পেছনে মায়ের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি।
লুসিন্দা মানুষ হয়েছিলেন তাঁর এক বড়লোক পিসিমার কাছে। এই পিসিমা ছিলেন অত্যন্ত গোঁড়া প্রকৃতির। খুব কড়া শাসনের মধ্যে মানুষ করতেন লুসিন্দাকে। ঘরের বাইরে যাওয়ার উপায় ছিল না। ঘরেই পড়াশুনা গান-বাজনা শেখার ব্যবস্থা করা হল। পিয়ানো শিখতেন লুসিন্দা। বন্দীদশার মধ্যে যখন হাঁপিয়ে উঠেছেন তখন একদিন দেখা হল জর্জ কারের সঙ্গে। লুসিন্দা তখন কুড়ি বছরের তরুণী। জর্জ কর চল্লিশ বছরের যুবক। বিয়ে হয়ে গেল দুজনের। দরিদ্র স্বামীর ঘরে এসে মানিয়ে নিলেন লুসিন্দা। নিজে ছোটখাট অনুষ্ঠানে গান করতেন, পিয়ানো বাজাতেন।
মায়ের সম্বন্ধে শ বলেছেন, “আমার মা ছিলেন সুন্দরের প্রতিমূর্তি। অনেক নামকরা শিল্পীর গান শুনেছি। কিন্তু মায়ের গানের মতো এমন পবিত্র সৌন্দর্য কারো গানে খুঁজে পাইনি। তাঁর গান শুনলে মনে হত গীর্জার প্রার্থনা সংগীত। এক স্বর্গীয় সুষমা ফুটে উঠত তাতে। মা মানুষ হয়েছিলেন কড়া শাসনের মধ্যে। তাই তিনি আমাদের দিয়েছিলেন পূর্ণ স্বাধীনতা। আজ আমি যে পৃথিবী-বিখ্যাত বার্নার্ড শ হতে পেরেছি তার জন্যে সবচেয়ে বেশি ঋণী বেশি কৃতজ্ঞ আমার মায়ের কাছে।”
দশ বছর বয়েসে সানিকে (শ-এর ছেলেবেলার নাম ছিল সানি) ভর্তি করে দেওয়া হল ডাবলিনের কনেকসানাল স্কুলে। এর আগে বাড়িতেই পড়াশুনা শুরু হয়ে গিয়েছিল। একজন শিক্ষয়িত্রীর কাছে পড়তেন সাহিত্য, ইতিহাস, অঙ্ক আর আমার কাছে শিখতেন পিয়ানো। নতুন স্কুলে কিছুদিন যাতায়াত করার পরেই হাঁপিয়ে উঠলেন সানি। স্কুলের আবহাওয়া, বাঁধাধরা পড়াশুনা, পরীক্ষা দেওয়ার তাঁর ভাল লাগত না। মাত্র ছ বছর বয়েসেই শিশু পাঠ্য বই –এর সীমানা অতিক্রম করে জন স্টুয়ার্ট মিলের আত্মজীবনী পড়ে ফেলেছিলেন। পাঠ্য বেইয়ের জগৎ তাঁকে বেশি আকর্ষণ করত। তবে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বিষয় ছিল সংগীত। সংগীতের সুরের মধ্যে তিনি যেন নিজেকে খুঁজে পেতেন।
স্কুলে পড়াশুনা হল না শ-বাড়িতেই পড়াশুনা করতে আরম্ভ করলেন। সারা দিন শুধু পড়া আর পড়া। এই একাগ্রতা, পরিশ্রম আর নিষ্ঠার সাথে মিশেছিল অনুরাগ আর মেধা। কিশোর বয়েসেই তিনি সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শনের বহু করেছিল শেকসপীয়রের নাটক। তখনই তিনি মনে মনে কল্পনা করতেন একদিন তিনিও শেকসপীয়রের মত মস্ত বড় নাট্যকার হবেন।
কিন্তু আচমকা সংসারে নেমে এল বিপর্যয়। তাঁর বাবা বড়লোক ছিলেন না। ব্যবসা করে যা আয় করতেন তাতে মোটামুটি স্বচ্ছলভাবে সংসার চলে যেত। কিন্তু হঠাৎ কারবারে মন্দা দেখা দিল। আয় বন্ধ হয়ে গেল। নিদারুণ অর্থকষ্ট প্রকট হয়ে উঠল। বাধ্য হয়ে শ-কে চাকরি নিতে হল।
শ-এর বয়স তখন পনেরো। এক জমির দালালীর অফিসে মাসে ১৮ শিলিং মাইনেতে চাকরি পেলেন। কিশোর বয়েসে চাকরিতে ঢুকতে হল বলে কোন দুঃখ ছিল না। বাবার কাছে শিখেছিলেন সব কিছুকে সমানভাবে মানিয়ে নিতে।
অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে চলত তাঁর লেখালেখি। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। তাঁর কোন লেখাই ছাপা হত না। মাঝে মাঝে রেগে গিয়ে সম্পাদকের কাছে চিঠি পাঠাতেন। তাতে বেশিরভাগিই থাকত অন্যের লেখার সমালোচনা। অবশেষে একদিন তাঁর একটি চিঠি ছাপা হল। চিঠির বিষয় ছিল নিরীশ্বরবাদ। সেটাই তাঁর জীবনের প্রথম মুদ্রিত লেখা। তখন শ-এর বয়েস পনেরো।
শ ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন অসাধারণ পরিশ্রমী। অল্পদিনের মধ্যেই অফিসের কাজে নিজের যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে ক্যাশিয়ারের পদ পেয়ে গেলেন। পাঁচ বছর অফিসে কাজ করলেন। কিন্তু ক্রমশই তাঁর মনে হচ্ছিল এই অফিসের চার-দেয়ালের মধ্যে তিনি যেন ফুরিয়ে যাচ্ছেন। হারিয়ে যাচ্ছে তাঁর বড় হবার স্বপ্ন। জীবনে যদি কিছু করতে হয় তাঁকে যেতে হবে লন্ডন শহরে। যেখানে জীবন কাটিয়েছেন তাঁর প্রিয় নাট্যকার শেকসপীয়ার।
চাকরিতে ইস্তফা দিলেন। বাবা আঘাত পেলেন। সংসারে যে নতুন করে অভাব দেখা দেবে, তার চেয়েও কথা লন্ডনে গিয়ে শ নিজের খরচ চালাবে কেমন করে! ছেলেকে সাহায্য করবেন, তাঁর তো সেই ক্ষমতাও নেই।
অত কিছু ভাববার মত মনের অবস্থা নেই শ-এর। একদিন সামান্য কিছু জিনিস আর সম্বল করে বেরিয়ে পড়লেন লন্ডনের পথে।
১৮৭৬ সালের এপ্রিল মাসে তিনি এসে পৌছলেন লন্ডন শহরে। তখন তাঁর মা লন্ডনে তাঁর এক দিদির কাছে ছিলেন। মায়ের কাছে এসে উঠলেন শ। ছেলের ইচ্ছার কথা শুনে তাঁকে নিরুৎসাহিত করলেন না। পিগমিলিয়ন শ-এর প্রথম নাটক বা চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়ে পৃথিবীজোড়া খ্যাতি অর্জন করল।
৮০ বছর বয়েসে শ-এর মা লুসিন্দা মারা গেলেন। জীবনের শেষ পর্বে এসে পরিপূর্ণ সুখ আর শান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি।
লুসিন্দার মৃত্যু হয়েছিল ১৯১৩ সালে। পরের বছর ইউরোপ জুড়ে শুরু হল বিশ্বযুদ্ধ। ইংল্যান্ডও জড়িয়ে পড়ল সেই যুদ্ধে। তিনি ছিলেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে। তিনি চেয়েছিলেন ইংল্যান্ড শান্তি স্থাপনের জন্য এগিয়ে আসুক। এক আবেদনে লিখলেন ইংরেজদের নিউটন, জার্মানদের লেবিননজ এঁদের বংশধররা যদি আজ বিদ্যমান দুই ‍শিবিরে বিভক্ত হয় তবে ইউরোপের সভ্যতা সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ বলে আর কিছুই থাকবে না।
কিন্তু সেদিন তাঁর বাণীকে গ্রহণ করবার মত কোন মানুষ ছিল না ইংল্যান্ডে। সকলেই তখন যুদ্ধের উন্মাদনায় মত্ত। তাঁর বাণীকে উপলব্ধি করছিল যুদ্ধের পরবর্তীকালে।
যুদ্ধের পরেই লিখলেন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটক ‘সেন্ট জোয়ান’- জোয়ান অব আর্কের জীবন অবলম্বন করেই ‍তিনি লিখলেন এই নাটক। এই নাটক তাঁকে  শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী হিসাবে পৃথিবীর মানুষের কাছে সম্মান এনে দিল। সমগ্র পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে লাগল সম্মান আর অভিনন্দন। এই চাইল। শ বিনীতভাবে লিখে পাঠালেন “বার্নার্ড শ-এই নামটির পেছনে কিম্বা আগে কোন উপাধির দরকার হয় না।
এরপর তাঁকে নোবেল পুরস্কারের কথা ঘোষণা করা হল। তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করলেন। বললেন, এখন আমাকে এই পুরুস্কার দেওয়া হল-যে ডুবন্ত মানুষ তীরে এসে পৌছেছে তাকে লাইফ বেল্ট ছুঁড়ে দেওয়ার মতন। তিনি আরো বললেন, যাঁরা এখনো সাহিত্যিক খ্যাতির তীরে এসে উঠতে পারেনি সেই নবীন উদীয়মান সুইডিস সাহিত্যিকদের জন্য টাকাটা ব্যয় করা হোক। তিনি সুইডেনে গিয়ে সমস্ত অর্থ উইল করে দিয়ে এলেন। বাড়িতে ফিরে এসে দেখেন এক চোর তাঁর ঘর থেকে পাঁচশো পাউন্ড চুরি করে নিয়ে গিয়েছে।
গৃহের পরিচারিকা পুলিশে খবর দিতে বললে তিনি সকৌতুকে বললেন- এতদিন ধরে পুলিশ চোর ধরছে। তারপর আদালতে তাকে সাজা দিচ্ছে। তবুও শ-বাড়িতে চুরি হল। এখন এই হারানো পাউন্ড উদ্ধার করতে গেলে পুলিশের পেছনে পেছনে ঘুরতে আমার যে সময় নষ্ট হবে সেই সময়ের মধ্যে আমি পাঁচশো পাউন্ড লিখেই উদ্ধার করতে পারব। চোর ঐ অর্থ ভোগ করুক, আমি আমার কাজ করি।
বয়েসের সাথে সাথে ক্রমশই আরো স্থির প্রশান্ত হয়ে আসছিলেন। তিনি যেন হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বের বিবেক। ১৯৩৮ সালে লন্ডনের বসবাস উঠিয়ে দিয়ে আইয়ট সেন্ট লরেন্সের নির্জন প্রকৃতির বুকে ঘর বাঁধলেন। বয়েসের ভারে দেহ নুয়ে পড়েছিল। কিন্তু মন চির নবীন সবুজ সতেজ, প্রাণশক্তিতে ভরপুর। তাঁর জীবিতকালেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন শিল্প, সাহিত্য, নাটক, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, সমস্ত বিষয়েই বিশ্বের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা। তাঁর বিচিত্র চরিত্রের মধ্যে সর্বদাই ফুটে উঠত প্রখর। ব্যক্তিত্ব। তাঁর সাথে একটি মানুষের তুলনা করা যায়, তিনি ভলতেয়ার। তাঁরই মত তিনি গলা পচাখচা সমাজকে ব্যঙ্গ আর বিদ্রুপে ক্ষতবিক্ষত করেছেন। তিনি চেয়েছিলেন-এই দূষিত সমাজ ধ্বংস হোক, তার জায়গায় গড়ে উঠুক নতুন সমাজ। নিজের মতকে প্রকাশ করতে তিনি কখনো সামান্যতম দ্বিধাগ্রস্ত হয়নি।
১৯৫০ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর বাগানে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হলেন। লন্ডনে নিয়ে গিয়ে অস্ত্রোপচার করা হল কিন্তু আর সুস্থ হলেন না। ক্রমশই তাঁর স্বাস্থ্যর অবনতি হল। অবশেষে ২রা নভেম্বর ভোরের আলো ফোটবার সাথে সাথে বার্নার্ড শ এর জীবনের আলো নিভে গেল। তখন তাঁর বয়স চুরানব্বই।
তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সম্বন্ধে টমাস মান লিখেছিলেন, আজ যাঁর মৃত্যু হল এমন প্রতিভাবান চরিত্রবান মানুষ বহু শতাব্দী পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেননি। তিনি তাঁর ঋজু মেরুদন্ড নিয়ে এলে শতাব্দীর শীর্ষে আরোহণ করেছিলেন। তাঁর কলমে ছিল শাণিত তরবারির তীক্ষ্নতা, উচ্চারিত বাণীতে সুকঠিন স্বচ্ছতা। মানুষের মধ্যে তিনি ছিলেন অতি মানুষ। জাতিতে আেইরিশ, বাস করেছেন ইংল্যান্ডে, কিন্তু দেশকাল জাতির সংকীর্ণ গণ্ডী অতিক্রম করে তিনি হয়েছিলেন বিশ্ব মানব। বিক্ষুব্ধ বিপর্যস্ত মানবতাকে তিনি কল্যাণের সুন্দরের স্পর্শে অপরূপ করে তুলেছিলেন।

টমাস আলভা এডিসন
[১৮৪৭-১৯৩১]

এডিসনের জন্ম ১৮৪৭ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি কানাডার মিলানে। তাঁর পিতা ছিলেন ওলন্দাজ বংশোদ্ভুত। কয়েক পুরুষ আগে এডিসন পরিবার হল্যান্ড ত্যাগ করে আমেরিকায় এসে আশ্রয় নেন। কিছুদিন পর তাঁরা আমেরিকা ত্যাগ করে কানাডায় এসে বসবাস শুরু করেন।
এডিসনের পিতার আর্থিক সচ্ছলতার জন্য ছেলেবেলার দিনগুলি আনন্দেই কেটেছিল। সাত বছর বয়েসে এডিসনের পিতা মিচিগানের অন্তর্গত পোর্ট হারান নামে একটা শহরে নতুন করে বসবাস শুরু করলেন।
এখানে এসেই স্কুলে ভর্তি হলেন এডিসন। ছেলেবেলা থেকেই অসম্ভব মেধাবী ছিলেন তিনি। কিন্তু স্কুলের বাঁধা পাঠ্যসূচী তাঁর কাছে খুব ক্লান্তিকর মনে হত। তাই ক্লাসে ছিলেন সকলের পেছনের ছাত্র। ক্লাসে ছিলেন সকলের পেছনের ছাত্র। ক্লাসে বসে খোলা জানলা দিয়ে বাইরের মুক্ত প্রকৃতির ‍দিকে চেয়ে থাকতে প্রায়ই আনমনা হয়ে যেতেন। শিক্ষকরা অভিযোগ করতেন, এ ছেলের প্রতি পড়াশুনায় কোন মন নেই। শিক্ষকদের কথা শুনে মনে হত এই ছেলে একদিন বিখ্যাত হবেই। স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনলেন এডিসনকে। শেষ হল এডিসনের তিন মাসের স্কুল জীবন। এর পরবর্তীকালে আর কোনদিন স্কুলে যাননি। এডিসন মায়ের কাছেই শুরু হল তাঁর পড়াশুনা।
ছেলেবেলা থেকেই এডিসনের ঝোঁক ছিল পারিপার্শ্বিক যা কিছু আছে, যা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত হয়, তা ‍নিয়ে ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা বার করতে পারেন কিনা দেখবার জন্য ঘরের এক কোণে ডিম সাজিয়ে বসে পড়লেন। কয়েক বছর পর কিশোর এডিসন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবার জন্য একটা ছোট ল্যাবরেটরি তৈরি করে ফেললেন তাঁর বাড়ির নিজের তলার একটা ঘরে। ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি বলতে ছিল কিছু ভাঙা বাক্স, কিছু শিশি বোতল, ফেলে দেওয়া কিছু লোহার তার, আর এখান-ওখান থেকে কুড়িয়ে আনা যন্ত্রপাতির টুকরো। অল্প কিছুদিন যেতেই তিনি বুঝতে পারলেন হাতে-কলমে পরীক্ষার জন্য প্রয়োজন যন্ত্রপাতি আর নানান জিনিসপত্রের। বাবার আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে ‍গিয়েছিল। অর্থ ছাড়া তো কোন পরীক্ষার কাজই চালানো সম্ভব নয়। এডিসন স্থির করলেন তিনি কাজ করে অর্থ সংগ্রহ করবেন। তেরো বছরের ছেলে চাকরি করবে! বাবা-মা দুজনেই তো অবাক। কিন্তু এডিসন জেদ ধরে রইলেন, একগুঁয়ে ছেলে একবার যা স্থির করবে কোনভাবেই তার নড়াচড়া হবে না। অগত্যা মত দিতে হল এডিসনের বাবা-মাকে।  কিন্তু তেরো বছরের ছেলেকে কাজ দেবে কে? অনেক খোঁজাখুঁজির পর খবরের কাগজ ফেরি করার কাজ পাওয়া গেল। ট্রেনে পোর্ট হুরোন স্টেশন থেকে ড্রেট্রয়েট স্টেশনের মধ্যে যাত্রীদের কাছে খবরের কাগজ বিক্রি করতে হবে। বিক্রির উপর কমিশন। আরো কিছু বেশি আয় করবার জন্য এডিসন খবরের কাগজের সাতে চকলেট বাদামও রেখে দিতেন। কয়েক মাসের মধ্যেই বেশ কিছু অর্থ সংগ্রহ করে ফেললেন।
এই সময় এডিসন সংবাদ পেলেন একটি ছোট ছাপাখানা কম দামে বিক্রি হচ্ছে। সামান্য যে অর্থ জমিয়েছিলেন তাই দিয়ে ছাপাখানা্র যন্ত্রপাতি কিনে ফেললেন, এবার নিজেই একটি পত্রিকা বার করে ফেললেন। সংবাদ জোগাড় করা, সম্পাদনা করা, ছাপানো, বিক্রি করা, সমস্ত কাজ তিনি একাই করতেন। অল্পদিনেই তাঁর কাগজের বিক্রির সংখ্যা বেড়ে গেল। এক বছরের মধ্যে তাঁর লাভ হল একশো ডলার। তখন তাঁর বয়েস পনেরো বছর।
দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর তৈরি হল কার্বন ফিলামেন্ট। এডিসন নিজেই লিখেছেন সেই চমকপ্রদ কাহিনী। “ফিলামেন্ট তৈরি হওয়ার পর তাকে কাচ তৈরির কারখানায় নিয়ে যেতে হবে। ব্যচিলবের (এডিননের এক সহকর্মী) হাতে কার্বনের ফিলামেন্ট। পেছনে আমি। এমনভাবে দুজনে চলেছি মনে হচ্ছে যেন কোন ,মহামূল্যবান সম্পত্তি নিয়ে যাচ্ছি। কাচের কারখানায় সবেমাত্র পা দিয়েছি, সম্ভবত অতি সতর্কতার জন্যেই হাত থেকে ফিলামেন্টটি মাটিতে পড়ে দু-টুকরা হয়ে গেল। হতাশ মনে ল্যাবরেটরিতে ফিরে গেলাম। নতুন ফিলামেন্ট তৈরি করে আবার চললাম কাচ কারখানায়। কপাল মন্দ, এইবার এক স্বর্ণকারের হাতের স্ক্রু ড্রাইভার পড়ে ভেঙে টুকরো হয়ে গেল। আবার ফিরে গেলাম। রাত হবার আগেই নতুন একটা কার্বন দিয়ে এসে বাল্বের মধ্যে ঢোকালাম। বাল্বের মুখ বন্ধ করা হল, তারপর কারন্ট দেওয়া হল। মুহূর্তে চোখের সামনে জ্বলে উঠল বৈদ্যুতিক বাতি।”
প্রথম বৈদ্যুতিক বাতিটি প্রায় চল্লিশ ঘণ্টা জ্বলেছিল। দিনটা ছিল ২১শে অক্টোবর ১৮৭৯ সাল, এডিসন সেদিন কল্পনাও করতে পারেননি তাঁর সৃষ্ট আলো একদিন পৃথিবীর সমস্ত গৃহের অন্ধকার দূর করবে। প্রথমে তিনি শুধুমাত্র বাল্বের উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন। এরপর প্রয়োজন দেখা দিল সমগ্র বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতির সাধন করা। এডিসন নতুন এক ধরনের ডাইনামো তৈরি করলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার জেনারেটর থেকে শুরু করে ল্যাম্প তৈরি করা, পর্যন্ত তাকে জ্বালানোর উপায় বার করা সমস্তই তাঁর উদ্ভাবন। যখন নিউইয়র্কে প্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র গড়ে উঠল, এডিসন ছিলেন একাধারে তার সুপারিনটেন্ডন্ট, তার ফোরম্যান, এমনকি তার মজদুর। এত কাজের বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েও কখনো বিব্রত বোধ করতেন না। আসলে দিন-রাতের প্রতিটি মুহূর্তকে তিনি কাজে লাগাতে চাইতেন। অকারণ বিশ্রাম, হাসি আমোদ সময় কাটাতে চাইতেন না।
একদিন একটি নিমন্ত্রিত বাড়িতে গিয়েছেন তিনি। গৃহকর্তা বিশেষ কাজে বাইরে গিয়েছিলেন। লোকজনের ভিড়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন এডিসন। আর অপেক্ষা না করে ফিরে যাবার জন্য বাইরের দরজার সামনে আসতেই গৃহকর্তার সাথে সাক্ষাৎ হল। এডিসনকে দেখামাত্রই তিনি বললেন, “আপনি এসেছেন দেখে আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। এখন আপনি কি নিয়ে কাজ করছেন?”
এডিসন সাথে সাথে বললেন, “কি করে আমি বার হতে পারি তাই নিয়ে।”
১৮৪৭ সালে এডিসন তাঁর বিখ্যাত মেনলো পার্ক ছেড়ে ওয়েস্ট অরেঞ্জে এলেন (West Orange)। এই সময় তিনি শব্দের গতির মত কিভাবে ছবির গতি আনা যায় তাই নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করছিলেন। মাত্র দু’বছরের মধ্যে তিনি উদ্ভাবন করলেন ‘কিনেটোগ্রাফ’ যা গতিশীল ছবি তোলবার জন্য প্রথম ক্যামেরা। যখন আমেরিকাতে বাণিজ্যিকভাবে ছায়াছবি নির্মাণের কাজ শুরু করার ভাবনা-চিন্তা চলছিল তখন সিনেমার প্রয়োজনীয় সব কিছুই উদ্ভাবন করে ফেলেছেন এডিসন। প্রথম অবস্থায় সিনেমা ছিল নির্বাক। ১৯২২ সালে এডিসন আবিস্কার করলেন কিনেটোফোন যা সংযুক্ত করা হল সিনেমার ক্যামেরার সাথে। এরই ফলে তৈরি হল সবাক চিত্র। অতি সাধারণ জিনিস থেকে সিনেমা ক্যামেরার মত জটিল যন্ত্রের উদ্ভাবনের কথা ভাবলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয়, কি অসাধারণ ছিল তাঁর প্রতিভা!
এডিসন তাঁর ছুটির দিনগুলি কাটাবার জন্য সুন্দর একটি বাড়ি তৈরি করেছিলেন। একদিন তাঁর বন্ধুবান্ধব আত্মীয় পরিজনদের সেই বাড়িতে এসে উপস্থিত হলে তাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবকিছু দেখালেন। বাড়ির বিভিন্ন কাজের সুবিধার জন্য যে সব যন্ত্রপাতি উদ্ভাসিত করেছেন তাও দেখাতে ভুললেন না। সকলেই মুগ্ধ, শুধু একজন অতিথি বললেন, “আপনার বাড়ির সবকিছুই ভাল শুধু বাড়িতে ঢোকবার গেটটা ভীষণ শক্ত। জোরে চাপ দিয়ে খুলতে হয়।”
এডিসন হাসতে হাসতে বললেন, “তোমরা যখন চাপ দিয়ে দরজা খুলছ তখন আট গ্যালন জল পাম্পে করে আমরা বাড়ির ছাদে ট্যাঙ্কে ভর্তি হচ্ছে।
মৃত্যুর কয়েকদিন আগে পর্যন্ত তিনি নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। প্রতিভায় বিশ্বাস করতেন না এডিসন, বলতেন, পরিশ্রমই হচ্ছে প্রতিভার মূল কথা। এই মহান কর্মবীর মানুষটি মৃত্যু হয় ১৯৩১ সালের ১৮ই অক্টোবর। তাঁর মৃত্যুর পর নিউইয়র্ক পত্রিকায় লেখা হয়, “মানুষের ইতিহাসে এডিসনের মাথার দাম সবচেয়ে বেশি। কারণ এমন সৃজনীশক্তি অন্য কোন মানুষের মধ্যে দেখা যায়নি।”

মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী (রঃ)
(১২০৭-১২৭৩ খ্রিঃ)

আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক কি? আল্লাহকে চেনা ও বুঝার উপায় কি? মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক কি? ইহজগতে থেকে মানবাকৃতি বজায় রেখে মানুষ কিভাবে অস্তিত্বহীন হতে পারে? নিয়তি ও কর্মের সমস্যার সমাধান কি? নফস কি এবং নফসের প্রভার থেকে মানুষের মুক্তি লাভের উপায় কি? এ সকল বিস্ময়কর প্রশ্নের জবাব যিনি প্রথম মানুষের সামনে ‍দিয়েছিলেন, তাঁর নাম মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী (রঃ)।
৬০৪ হিজরীর ৬ রবিউল আউয়াল মোতাবেক ১২০৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯ সেপ্টম্বর এ মহামনীষী বর্তমান আফগানিস্তানের বলখ নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল বাহাউদ্দিন ওয়ালিদ। পিতা ছিলেন তৎকালের স্বনামখ্যাত কবি ও দরবেশ। জানা যায় ‍পিতা বাহাউদ্দিন ওয়ালিদের পাণ্ডিত্যের খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে পারস্যের রুম প্রদেশের অন্তর্গত ‘কুনিয়া’র তৎকালীন শাসনকর্তা আলাউদ্দিন কায়কোবাদ মনীষী বাহাউদ্দিন কুনিয়ায় আমন্ত্রণ করে পাঠান। আমন্ত্রণ পেয়ে বাহাউদ্দিন ওয়ালিদ সপরিবারে কুনিয়ার চলে যান এবং রাজনৈতিক কারণে তিনি সেখানে বাসস্থান নির্মাণ করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এ রুম প্রদেশের নাম অনুসারে ‍তিনি ‘রুমী’ নামে খ্যাতি লাভ করেন।
৫ বছর বয়স থেকেই মাওলানা রুমী (রঃ) এর মধ্যে বিভিন্ন আলৌকিক বিষয়াদি পরিলক্ষিত হতে থাকে। বাল্যকালে তিনি অন্যান্য ছেলেমেয়েদের ন্যায় খেলাধূলা ও আমোদ প্রমোদ লিপ্ত থাকতে পছন্দ করতেন না। তিনি সর্বদা ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আলোচনা পছন্দ করতেন। ৬ বছর বয়স থেকেই ‍তিনি রোজা রাখতে শুরু করেন। ৭ বছর বয়সে তিনি সুমধুর কণ্ঠে পবিত্র কোরআন বিশুদ্ধভাবে তেলাওয়াত করতেন।কোরআন তেলায়াদের সময় তাঁর দু’নয়নে অশ্রুধারা প্রবাহিত হত। সম্ভবত এ বয়সেই তিনি কোরআনের মর্মবাণী ও আধ্যাত্মিক বিষয়াদি অনুধাবন করতে পারতেন। কথিত আছে মাওলানা রুমী (রঃ) এর বয়স যখন ৬ বছর তখন পিতা বাহাউদ্দিন বালক (রঃ) কে সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ইরানের নিশাপুরে যান এবং সেখানে বিখ্যাত দার্শনিক ও কবি শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তাবের সাক্ষাৎ লাভ করেন। শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তাব বালক জালাল উদ্দিনের মুখচ্ছবি দেখেই তাঁর উজ্জ্বল ভবিষ্যত বুঝতে পেরে তাঁর জন্যে দোয়া করেন এবং তাঁর প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখা জন্যে পিতাকে উপদেশ দেন। নিশাপুর ত্যাগ করে পিতা বাহাউদ্দিন রুমী (রঃ) কে সঙ্গে নিয়ে পবিত্র হজ্জ সম্পাদন করেন এবং বাগদাদসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। পিতা নিজেই তাঁর পুত্রকে আথ্যাত্মিক জ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দিতে লাগলেন। শিক্ষা লাভের প্রতি তাঁর ছিল পরম আগ্রহ।
১২৩১ সালে পিতার মৃত্যুর পর মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী (রঃ) মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েন এবং জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে মারাত্মক বাধাঁ এসে দাঁড়ায়। মাতাকে হারিয়ে ছিলেন আরো কয়েক বছর পূর্বে। এ সময়ে কুনিয়া শহরে তিনি সাহচর্য লাভ করেন পিতার প্রধান শিষ্য তৎকালীন পন্ডিত ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী সৈয়দ বোরহান উদ্দিনের। সৈয়দ বোরহান উদ্দিন পিতৃ শোকাকুল মাওলানা রুমী (রঃ) কে শিক্ষা দান করেন। এরপর উচ্চতর শিক্ষা লাভের জন্যে তিনি চলে যান প্রথমে সিরিয়া ও পরে দামেস্কে। তিনি দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৭ বছর অধ্যয়ন করেন। এছাড়া জ্ঞানের সন্ধানে তিনি ৪০ বৎসর বয়স পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান দেশ থেকে দেশান্তরে। তিনি তাঁর শিক্ষা জীবনে তৎকালীন যুগ শ্রেষ্ঠ মনীষীদের সাহচর্য লাভ করেন। তিনি যাদের থেকে জ্ঞান লাভ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে শামসুদ্দিন তাব্রীজ (রঃ), ইবনে আল আরাবি (রঃ), সালাউদ্দিন ও হুসামউদ্দিন এর নাম উল্লেখযোগ্য। জালাল রুমী (রঃ) এত জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন যে, তৎকালীন সময়ে তাঁর সাথে অন্য কারো তুলনা ছিল না। কথিত আছে ১২৫৯ সালে চেঙ্গীস খানের পৌত্র হালাকু খান যখন বাগদাদ অধিকার করে তদীয় সেনাপতি কুতববেগকে দামেস্কের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন তখন দামেস্কবাসীদেরকে সহযোগিতা করার জন্যে ধ্যানযোগে তিনি দামেস্কে উপস্থিত হয়েছিলেন।
পিতার মৃত্যুর পর রুমী (রঃ) পিতার গদীনেশীন হন। বিভিন্ন দেশ থেকে তাঁর নিকট আগত হাজার হাজার লোকদেরকে তিনি শিক্ষাদান করেন। তিনি বহু কিতার লিপিবদ্ধ করেছেন। তাঁর গ্রন্থাবলীর মধ্যে ‘মসনবী’ ও ‘‍দিওয়ান’ তাঁকে অমর করে রেখেছে। বাংলা ভাষা সহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় তাঁর গ্রন্থ ‘মসনবী’ অনূদিত হয়েছে। আলেমগণ আজও বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় আলোচনা সভায় তাঁর রচিত কবিতা আবৃত্তি করে শ্রোতামন্ডলীকে আকৃষ্ট করে থাকেন। পারস্যে পবিত্র কোরআন ও হাদিসের পরই ‘মসনবী’ কে যথার্থ পথ প্রদর্শক বলে মনে করা হয়। ‘দিওয়ানে’ রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার শ্লোক, যার প্রায় সমস্তই আধ্যাত্মিক গজল। তাঁর সৃষ্ট সাহিত্য ও সংস্কৃতি অতুলনীয়। ‘ইলমে মারেফত’ ও  ‘এলমে লাদুনিতে’ তিনি অসাধারণ পান্ডিত্য লাভ করেছিলেন। এটা হলো শ্রেষ্ঠ জ্ঞানের আলয়। সুফীর মতে দেহই মানবাত্মা ও পরমাত্মার মিলনের মহা অন্তরায়। দেহের ভিতরে যে কামনা ও বাসনা মানুষকে সর্বদা সত্যপথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, যা মানুষকে ব্যক্তিত্ব বা অহংকার প্রদান করে ভোগলিপ্সু করে, সে জৈব আকাংখার নাম সুফীদের ভাষায় ‘নফর’। নফসের ধ্বংসই দেহের কর্তৃত্বের অবসান ও আত্মার স্বাধীনতার পূর্ণতা। তাই নফসের বিরুদ্ধে সুফীদের আজীবন সংগ্রাম। রুমী (রঃ) তাঁর সারাটা জীবন নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন। রুমীর মতে বুদ্ধি, যুক্তি ও ভক্তি এক নয়। বুদ্ধি ও যুক্তি দিয়ে আল্লাহকে চিনা, বুঝা ও পাওয়া যায় না। বরং এর জন্যে প্রয়োজন বিশ্বাস ও ভক্তি। ভক্তিই সোপান। আর ভক্তির উৎস হচ্ছে প্রেম ও আসক্তি। রুমীর মতে আল্লাহ নির্পুণ নন। জ্ঞান, বুদ্ধি ও যুক্তির মাপকাঠি দিয়ে আল্লাহর গুণাবলী অনুধাবন করতে পারে না। কারণ বুদ্ধি ও যুক্তি নিজেই একটি সৃষ্ট বস্তু এবং মস্তিস্ক ও স্নায়ুমন্ডলীর সক্রিয়তার উপর নির্ভরশীল। সুতরাং সৃষ্ট দিয়ে অসৃষ্টকে বুঝা সম্ভব নয়। আল্লাহকে বুঝতে ও চিনতে হলে ভক্তি ও বিশ্বাসের প্রয়োজন। তাহলেই অন্তর দিয়ে আল্লাহকে অনুধাবন করতে পারবে। মানুষ যখন মা’রেফাতের ঊর্ধ্বতন স্তরে উন্নীত হয়ে আপনার ভিতর আল্লাহর প্রকাশ অনুভব করে তখন তাঁর ব্যক্তিত্বের সীমা কোথায় ভাসিয়ে যায়। তিনি তখন অসীমের ভিতর আপনাকে হারিয়ে ফেলেন। কিংবা তিনি নিজের সীমার ভিতরই অসীমের সন্ধান লাভ করেন। তখন তিনি আনন্দে বিভোর হয়ে বিশ্ব ভ্রহ্মান্ডের রাজৈশ্বর্যকে একেবারেই তুচ্ছ বোধ করেন। মারেফাতের স্তর উন্নীত হলে আত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে আর কোন ভেদাভেদ থাকে না। এ অবস্থার নাম হলো ‘হাল’। এ কথাগুলো পৃথিবীর মানুষের সামনে অস্তিত্বহীন হতে পারে তা মাওলানা রুমী (রঃ)। ইহজগতে থেকে মানবাকৃতি বজায় রেখে মানুষ কিভাবে অস্তিত্বহীন হতে পারে তা মাওলানা রুমী (রঃ) দেখিয়েছেন।
মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমী (রঃ) ‘ভাগ্য ও পুরস্কার’ সমস্যার সহজ সমাধান দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের সকল কার্যের নিয়ন্তা আল্লাহ। কিন্তু এর সংগে তিনি এটাও স্বীকার করেছেন যে, আল্লাহ পাক মানুষকে কতকগুলো কার্যের পূর্ণ স্বাধীনতা বা স্বেচ্ছাধিকার দিয়েছেন, যার সীমারেখার মধ্যে মানুষ নিজেই তার কর্মপন্থা নির্বাচনের অধিকারী। এ সকল কার্যাদির কর্মফলের জন্যে মানুষ নিজেই দায়ী। কারণ এগুলো করা না করা তারই স্বেচ্ছাধিকার ভুক্ত, যদিও কর্ম করার শক্তি আল্লাহই মানুষকে প্রদান করেছেন। রুমী (রঃ) ছিলেন তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ পন্ডিত ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী।
রুমী (রঃ) খুবই সাধারণ জীবন যাপন করতেন। তিনি দুনিয়ার ভোগ বিলাস ও ঐশ্বর্যকে তুচ্ছ মনে করতেন। তিনি যে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন সে তুলনায় দুনিয়া তুচ্ছ হওয়াটাই স্বাভাবিক। মৃত্যুকালে তাঁর কোন সঞ্চিত ধন-সম্পদ ছিল না। ৬৬ বছর বয়সে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর অসুস্থতার সংবাদ প্রচারিত হবার সাথে সাথে চতুদিক হতে হাজার হাজার লোক গভীর উদ্বেগের সাথে ছুটে আসে। তৎকালীন বিখ্যাত চিকিৎসক শেখ সদরউদ্দিন, আকমাল উদ্দিন ও গজনফার তাঁর চিকিৎসা করে ব্যর্থ হন। এ সময় রুমী (রঃ) চিকিৎসক শেখ সদরউদ্দিন সাহেবকে লক্ষ্য করে বললেন, “আশেক ও মাশুকের মধ্যে একটি মাত্র পর্দার ব্যবধান রয়েছে। আশেক চাচ্ছে তার মাশুকের নিকট চলে যেতে। পর্দাটা যেন দ্রুত উঠে যায়।”শেখ সদরউদ্দিন বুঝতে পেরেছিলেন, রুমী (রঃ) এর আয়ু শেষ হয়ে আসছে; অর্থাৎ রুমী (রঃ) আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যাওয়ার জন্য তখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এরপর তিনি তাঁর শিষ্যদের সান্ত্বনা দিয়ে কিছু উপদেশ দিলেন, যার কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ
ইন্দ্রিয় লালসাকে কখনো প্রশ্রয় দিবে না। পাপকে সর্বদা পরিহার করবে। নামাজ ও রোজা কখনো কাযা করবে না। অন্তরে ও বাহিরে সর্বদা আল্লাহকে ভয় করে চলবে। বিপদে ধৈর্য্যধারণ করবে। বিদ্রোহ ও প্রতিশোধমূলক মনোভাব পোষণ করবে না। নিদ্রা ও কথাবার্তায় সাধ্যানুযায়ী সংযমী হবে। কাউকে কোন প্রকার কষ্ট দিবে না। সব সময় সৎ লোকদের সংস্পর্শে থাকবে। মনে রাখবে, মানুষের মধ্যে তিনিই শ্রেষ্ঠ, যার দ্বারা দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধিত হয়। তারপর তিনি বললেন, মানুষের দেহ নশ্বর কিন্তু তার আত্মা অবিনশ্বর। এ নশ্বর দেহ ধ্বংস প্রাপ্ত হয় বটে; কিন্তু তার ভিতর যে অবিনশ্বর আত্মা রয়েছে তা চিরকালই বেঁচে থাকে।
এরপর এ বিখ্যাত মনীষী ১২৭৩ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন। এ সময়ে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর।

ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল
[১৮২০-১৯১০]

১৮৫০ সাল। ক্রিমিয়ার প্রান্তরে ইংল্যান্ড ও রাশিয়ার যুদ্ধ চলেছে। দুই পক্ষেই শত শত সৈনিক নিহত হচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে কুটারিতে তৈরি হয়েছে আহত সৈনিকদের জন্য হাসপাতাল। মুমূর্ষু মানুষের আর্তনাদে চারদিকের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তার মাঝে চলেছেন। কোন ক্লান্ত নেই, বিরক্তি নেই। দু  চোখ জুড়ে বয়েছে ভালবাসা, স্নেহের পরশ। যখনই তিনি কারো পাশে গিয়ে দাঁড়ান, মুহূর্তে সে ভুলে যায় তার সব ব্যথা যন্ত্রণা।
সর্বপ্রথমে হাসপাতাল চত্বর পরিস্কার করবার জন্য ঝাডুন তোয়ালের প্রয়োজন দেখা দিল। সরকারী দপ্তরের যে কর্মচারীর কাছে এই সব ছিল, ফ্লোরেন্স বুঝতে পারলেন তা সংগ্রহ করতে গেলে আইনের নানা বেড়াজাল পেরিয়ে আসতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। তিনি টাইমস তহবিলের কাছে আবেদন জানালেন। সেখানেও অনিয়ম। আহত সৈনিকদের জন্য পরিচ্ছন্ন পোশাক দরকার। নিরুপায় হয়ে ফ্লোরেন্স স্কুটারিতে নিজেই একটি বিশাল লন্ড্রী খুলে ফেললেন, ততদিনে পোশাক তোয়ালে আসতে আরম্ভ করেছে। ফ্লোরেন্স আদেশ দিলেন মালের পেটি আসা মাত্রই যেন তা খুলে ফেলা হয়। আইনকানুন আর নিয়মের বেড়াজালে যেন এক মুহূর্ত বিলম্ব না হয়।
ফ্লোরেন্সের আত্মত্যাগ কর্মনিষ্ঠা ভালবাসা মানুষকে উজ্জীবিত করতে থাকে। সকলেই কর্মতৎপর হয়ে ওঠে।
হাসপাতাল পরিস্কার করে আহত সৈনিকদের যত্নের দিকে মনোযোগ দিলেন ফ্লোরেন্স। এতদিন বাহিনীর হাসপাতাল যে পদ্ধতিতে পরিচালিত হত তিনি তার আমূল পরিবর্তন করলেন। সে সমস্ত কর্মচারীরা হাসপাতালের কাজের উপযুক্ত নয় বিবেচনা করলেন, তিনি তাদের অন্যত্র পাঠিয়ে দিলেন। একদিকে তিনি ছিলেন দয়ার প্রতিমূর্তি অন্যদিকে কঠিন কঠোর। কাজের সামান্যতম বিশৃঙ্খলা বিচ্যুতি সহ্য করতে পারতেন না।
ফ্লোরেন্স স্কুটারিতে পৌছবার কয়েকদিন পর এক বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছেন, “সেই সমস্ত অফিসারদের প্রতি আমার কিছু সহানুভূতি আছে যারা আমার ক্রমাগত চাহিদা পূরণ করতে করতে দিশাহারা হয়ে পড়েছে। কিন্তু সেই সমস্ত লোক যারা মানুষের মৃত্যু মেনে নিতে পারবে কিন্তু সরকারী কেতা- কানুন ভেঙে একটি ঝাঁটা দেবে না-তাদের ‍প্রতি আমার সামান্যতম সহানুভূতি নেই।”
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রাথমিক কাজকর্ম শেষ করে সমস্ত হাসপাতালকে ঢেলে সাজাবার ব্যবস্থা করলেন। হাসপাতালের কর্মচারীদের স্বতন্ত্র দল তৈরি করে তাদের উপর জিনিসপত্র কেনার ভার পড়ল, কারোর উপর সমস্ত হাসপাতাল পরিচ্ছন্ন রাখা, কারো উপর রুগীদের পোশার-পরিচ্ছদের দায়িত্ব দেওয়া হল। শুধুমাত্র দায়িত্বভার আরোপ করেই নিশ্চিত হলেন না ফ্লোরেন্স। যাতে প্রত্যেককে আপন আপন কর্ম দায়িত্বভার আরোপ করেই নিশ্চিন্ত হলেন না ফ্লোরেন্স। যাতে প্রত্যেককে আপন আপন কর্ম দায়িত্বভার সুষ্ঠুভাবে পালন করে তার দিকে প্রতি মুহূর্তে সজাগ দৃষ্টি রাখতেন।দিনের শেষে সকলের কাজের বিশ্লেষণ করতেন, ভুল-ত্রুটি দূর করে আরো কর্মদক্ষ হয়ে উঠবার পরামর্শ দিতেন। অল্প কিছুদিনে মধ্যেই সমগ্র হাসপাতালের চেহারা সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হল। শুধু তাই নয়, নতুন কয়েকটি ওয়ার্ড খোলা হল।চার মাইল অঞ্চল জুড়ে গড়ে উঠল এই হাসপাতাল। ফ্লোরেন্স ছিলেনে এই্ হাসপাতালের এক সেবার প্রতিমূর্তি। দিন-রাত্রির প্রায় সবটুকু অংশই তাঁর কেটে যেত এই হাসপাতালের আঙিনায়। কখনো তিনি আহতদের ক্ষতস্থান পরিস্কার করে ব্যন্ডেজ বেঁধে দিচ্ছেন, কখনো তাদের পোশাক পরিয়ে দিচ্ছেন। আবার সহকর্মীদের হাতে হাত লাগিয়ে হাসপাতাল আঙিনা পরিস্কার করছেন। রুগীদের জন্য খাবার তৈরি করছেন। আবার তিনিই রাতের গভীরে সকলে যখন ঘুমিয়ে আছে, প্রদীপ হাতে রুগীদের বিছানার পাশে ঘুরে বেড়াতেন। রুগীরা মুগ্ধ বিস্ময়ে চেয়ে দেখত। তাদের মনে হত এক মূর্তিময়ী দেবী যেন তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। সব দুঃখ যন্ত্রণা মুহূর্তে ভুলে যেত তারা। একজন সৈনিক লিখেছেন যখন তিনি আমাদের পাশ দিয়ে হাঁটতেন, এক অনির্বচনীয় আনন্দে আমাদের সমস্ত মনপ্রাণ ভরে উঠত। তিনি প্রত্যেকটি বিছানার পাশে এসে দাঁড়াতেন। কোন কথা বলতেন না, শুধু মুখে ফুটে উঠত মৃদু হাসি। তারপর তিনি যখন আমাদের অতিক্রম করে যেতেন, তাঁর ছায়া পড়ত আমাদের শয্যার উপর। সৈনিকরা পরম শ্রদ্ধার সেই ছায়াকেই চুম্বন করত। তারা বলত ‘দীপ হাতে রমণী’। এই নামেই তিনি সমস্ত পৃথিবীর মাঝে অমর হয়ে রইলেন। যুদ্ধ যতই এগিয়ে চলল তাঁর কর্মভার বেড়েই চলল। যুদ্ধের প্রয়োজনে যেখানে যত হাসপাতাল তৈরি হয়েছিল, সব হাসপাতালে ঘুরে বেড়াতেন। সেখানকার কাজের তত্ত্বাবধান করতেন। তাঁর আন্তরিক চেষ্টায় মৃত্যুর হার হাজারে ষাট থেকে তিনি এসে দাঁড়াল।
তবুও বিশ্রাম নেই ফ্লোরেন্সর। শুধু আহত মানুষের দেহের সুস্থতা নয়, মনের আনন্দের ব্যবস্থা করতেও তিনি সচেষ্ট হয়ে উঠলেন। আহত সৈনিকরা  যাতে নিয়মিত বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারে, তিনি তার ব্যবস্থা করলেন। প্রতিটি হাসপাতালে গড়ে তুললেন লাইব্রেরি। সেখানে আমোদ-প্রমোদের জন্য শুধু বই ছাড়াও বিভিন্ন সংবাদপত্র আনার ব্যবস্থা করলেন। হাসপাতাল ব্যবস্থার সমস্ত চেহারাটাই পরিবর্তিত হয়ে গেল। এতদিনের প্রচলিত ব্যবস্থা ভেঙে জন্ম নিল নতুন সম্পূর্ণ বিজ্ঞান সম্মত আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার। শুধু হাসপাতাল নয়, বহুবার তিনি গিয়েছেন যুদ্ধের প্রান্তরে। বুঝেছিলেন শুধু অস্ত্র বা সামরিক শিক্ষা একজন সৈনিককে তার দক্ষতার চরম শিখরে পৌছে দিতে পারে না। তাদের জন্যেও পাঠাতেন গরম খাবার, নানান বই । এই অক্লান্ত পরিশ্রমে তাঁর শরীর ক্রমশই ভেঙে পড়ছিল, মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়তেন তিনি। একবার এত অসুস্থ হয়ে পড়লেন, ডাক্তাররা প্রায় তাঁর জীবনের আশা ত্যাগ করেছিল। কিন্তু তাঁর অদম্য মনোবল, জীবনীশক্তির তাগিদে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। কিন্তু সকলের সমস্ত অনুরোধই ‍তিনি প্রত্যাখ্যান করে বললেন, যতক্ষণ না শেষ আহত সৈনিকটি দেশে  প্রত্যাবর্তন করছে ততক্ষণ তাঁর পক্ষে স্কুটারি ত্যাগ করা সম্ভব নয়।
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের এই অজেয় মনোভাবের জন্য সমস্ত ইংল্যান্ড তাঁর প্রতি শ্রদ্ধায় প্রশংসায় মুখরিত হয়ে ওঠে। মহারানী ভিক্টোরিয়া তাঁকে লিখলেন, “যেদিন আপনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন সেই দিনটি আমার কাছে বিরাট আনন্দের দিন কারণ সমস্ত নারী জাতিকে আপনি সুমহান গৌরবে মহিমান্বিত করেছেন। আপনার সুস্থতার জন্য ঈশ্বরের কাছে আন্তরিক প্রার্থনা করি।”
অবশেষে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটল। ১৮৫৬ সাল, দীর্ঘ দু বছর আহত সৈনিকদের সেবার করে ফ্লোরেন্স নাইর্টিঙ্গেলে ফিরে চললেন তাঁর সম্মানে ব্রিটিশ সরকার একটি আলাদা জাহাজ পাঠাতে চাইলেন। কিন্তু সে অনুরোধ তিনি ‍প্রত্যাখ্যান করলেন, সকলের সাথেই দেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। সমস্ত দেশ তাঁকে বিপুল সম্মান জানাবার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু সবিনয়ে সব কিছুকে প্রত্যাখ্যান করলেন সামান্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল না। শুধুমাত্র মহারানী ভিক্টোরিয়ার দেওয়া সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগদান করার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না।
ক্রিমিয়ার যুদ্ধের মধ্যে তিনি শুধু নিজেকে একজন সেবিকা নিয়ম ভেঙে নারীকে দিলেন সম্মানের আসন। প্রচলিত কুসংস্কারে নিগড় ভেঙে সেবার কাজকে (Nursing) মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করলেন। কিন্তু তখনো তাঁর কাজ শেষ হয়নি। তাঁর আদর্শ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার কাজ বাকি রয়ে গিয়েছিল।
ফ্লোরেন্সের ইচ্ছা ছিল দেশে প্রথম নার্সিং স্কুল স্থাপন করবেন। সমগ্র ইংল্যান্ডের মানুষ তাঁকে সম্মান জানাতে পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড অর্থ তুলে দিল। সেই অর্থে ১৮৫৯ সালে সেন্ট টমাস হাসপাতালে তৈরি হল প্রথম নার্সিং স্কুল, “নাইটিঙ্গেল হোম” যা আধুনিক নার্সিং শিক্ষার প্রথম পাঠগৃহ।
শারীরিক অক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এই স্কুলের পঠন-পাঠন পরিচালনা বিধি ব্যবস্থা নিজেই নিরূপন করতেন। নার্সিং শিক্ষার সাথে সাথে সামরিক চিকিৎসা সম্বন্ধেও তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ। ১৮৫৮ সালে তিনি প্রকাশ করলেন আটশো পাতার একখানি বিবরণী, Note on matters affecting the health, efficiency and Hospital Administration of the British Army. এছাড়া তিনি নার্সিং- এর উপর একাধিক বই লিখলেন।
শুধু র্নাসিং নয়, হাসপাতাল পরিচালনা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও তাঁর মূল্যবান পরামর্শ শুধু ইংল্যান্ড নয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও গ্রহণ করতে থাকেন। সমগ্র হাসপাতাল পরিচালন ব্যবস্থার তিনি আমূল পরিবর্তন করেন। ভারতবর্ষ সম্বন্ধেও ফ্লোরেন্সের আগ্রহ ছিল গভীর। সিপাই বিদ্রোহের সময় তিনি ভারতবর্ষে গিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
ফ্লোরেন্সের দেহের কর্মক্ষমতা প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে আসছিল। একসময় শারীরিক দিক থেকে সর্ম্পূণভাবে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন তিনি। এরপরেও বহু বছর বেঁচেছিলেন তিনি। রোগ যন্ত্রণাকে অতিক্রম করে তাঁর অন্তরে জেগে থাকত এক গভীর আনন্দ। তিনি তাঁর জীবিতকালেই প্রত্যক্ষ করেছেন তাঁর শিক্ষা, সাধনা ব্যর্থ হয়নি। দেশে দেশে গড়ে উঠছে নার্সিং স্কুল। যে পেশা একদিন ছিল ঘৃণিত তাই হয়ে উঠেছে পরম সম্মানের। নতুন প্রজন্মের মেয়েরা নার্সিংকে জীবনের ব্রত হিসাবে গ্রহণ করছে।
জীবিতকালে বহু সম্মান পেয়েছেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। কিন্তু তাঁর আদর্শের বাস্তব রূপ দেখে যে আনন্দ পেয়েছেন তার চেয়ে বড় পাওয়া তাঁর কাছে আর কিছুই ছিল না।
অবশেষে ১৯১০ সালের ১৩ই আগস্ট এই মানব দরদী মহীয়সী নারীর মৃত্যু হয়।

আল্লামা শেখ সা’দী (রঃ)
(১১৭৫-১২৯৫ খ্রিঃ)

গগণের  উদারতা ও স্বর্গের শান্তির বাণী নিয়ে সময় যে যে সবল মহাপুরুষ মর্ত্যের দ্বারে আতিথ্য গ্রহণ করেন এবং জগতের কিঞ্চিত যর্থাথ কল্যাণ সাধন দ্বারা স্মৃতিপটে অক্ষয় পদচিহ্ন রেখে যান, শেখ সা’দী  (রঃ)  তাঁদের মধ্যে অন্যতম। সীমাহীন দারিদ্রতার মধ্যে ও তিনি ধর্য্যের সাথে জ্ঞান অর্জন, পদব্রজে দেশ ভ্রমণ, কাব্য  ও সাহিত্য রচনা এবং আধ্যাত্মিক চিন্তার মধ্যে দিয়ে কাটিয়েছিলেন সারাটা জীবন। ডাক ও তার প্রথার যখন সৃষ্টি হয়নি, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত শত শত পত্র পত্রিকার অবাধ প্রচার যখন ছিল না; লঞ্চ, বাস, ট্রেন কিংবা প্লেনে চড়ে পৃথিবী ভ্রমণ করা যখন সম্ভব ছিল না; ধর্ম সাহিত্য ও ইতিহাসের অভিনব বার্তা যখন জনগণের নিকট পৌছবার কোন সুযোগ ছিল না, তখন শেখ সা’দী (রঃ) নৈশ নক্ষত্রের ন্যায় আপন অনাড়ম্বর কিরণ ধারা উৎসারিত করে জনগণের দুয়ারে সে আলোক রশ্মি বিতরণ করতেন।
স্যার আউসলী এর মতে ১১৭৫ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের ফারেস প্রদেশের অর্ন্তগত সিরাজ নগরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আয়ু ১২০ বছর। তবে তাঁর জন্ম ও মৃত্যু সাল নিয়ে মতভেদ আছে। কারো কারো মতে তাঁর জন্ম সাল ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে এবং আয়ু ১০২ বছর। কিন্তু মুজাফফর উদ্দীন আতাবেক সা’দ বিন জঙ্গীর রাজত্বকালে যে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন তাতে কোন দ্বিমত নেই। বাল্যকালে তাঁর নাম ছিল শেখ মোসলেহ উদ্দীন। জানা যায়, ফারেসের শাসনকর্তা আতাবেক সা’দ বিন জঙ্গীর রাজত্বকালে তিনি যখন কবিতা লিখতেন তখন আপন নামের সাথে ‘সা’দী’ লিখতেন এবং এ নামেই তিনি সুখ্যাতি লাভ করেন। সা’দীর পিতা রাজ দরবারে চাকুরী করতেন এবং তিনি খুব ধার্মিক। ফলে শৈশব থেকেই সা’দীর পিতা রাজ  দরবারে চাকুরী করতেন এবং তিনি খুব ধার্মিক। ফলে শৈশব থেকেই সা’দী ধমীয় অনুশাসনের ভিতর দিয়ে গড়ে উঠেন । কোন অসৎ সঙ্গ তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। শৈশবেই তাঁর মধ্যে পরিলক্ষিত হয় অসাধারণ প্রতিভা।শিক্ষা লাভের প্রতি ছিল তাঁর অস্বাভাবিক আগ্রহ। কিন্তু শৈশবেই পিতা মৃত্যুবরণ করায় তিনি  হয়ে পড়েন নিতান্ত ইয়াতীম ও অসহায়।  পিতার আর্থিক অবস্থাও ভাল ছিল না। সরকারী চাকুরী করে পিতা যে সামান্য বেতন পেতেন তা দিয়েই খুব কষ্ট করে তাঁকে সংসার চালাতে হত। কিন্তু পিতার মৃত্যুতে সংসারে নেমে আসে চরম দারিদ্রতা এবং তাঁর শিক্ষা লাভের উপর আসে মারাত্মক আঘাত। কিন্তু এ অসহায়ত্ব ও দারিদ্রের মধ্যে ও তিনি ধৈর্য্য হারাননি। শেখ সা’দী (রঃ) এর জীবনকে মূলত চারটি ভাগে ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ৩০ বছর শিক্ষা লাভ, দ্বিতীয় ৩০ বছর দেশ ভ্রমণ, তৃতীয় ৩০ বছর গ্রন্থ রচনা এবং চতুর্থ ৩০ বছর আধ্যাত্মিক চিন্তা ও সাধনা।
পিতার মৃত্যুর পর তিনি সিরাজ নগরের গজদিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। কারো মতে ফারাসের শাসনকর্তা আতাবেক সা’দ বিন জঙ্গী দয়াপর্বশ হয়ে স্বয়ং ইয়াতীম শেখ সা’দীর আশ্রয় দান বিদ্যা শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন । উক্ত মাদ্রাসায় নিশ্চিত মনে বেশী দিন শিক্ষা লাভ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। কারণ তখন রাজ্যের সর্বত্র রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা  ও অশান্তি বিরাজ করছিল।  তিনি উচ্চ শিক্ষা লাভের আশায় দারিদ্রের সাথে লড়াই করে চলে যান বাগদাদের নিযামিয়া মাদ্রাসা ছিল তৎকালীন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ধমীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বাগদাদে এসে তিনি অনাহারে, অর্ধাহারে এবং আশ্রয়ের অভাবে দিনের পর দিন পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। অতঃপর ‍তিনি একজন সহৃদয় ব্যক্তির সহযোগিতায় স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে শিক্ষা লাভ শুরু  করেন। তাঁর প্রতিভা, তীক্ষ্মবুদ্ধি এবং শিক্ষা লাভে তার অসাধারণ প্ররিশ্রমের প্রেক্ষিত খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর প্রতি শিক্ষকগণের সুদৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। এরপর তিনি ভর্তি হন বাগদাদের নিযামিয়া মাদ্রাসায়। সেখানে তিনি বিখ্যাত আলেম আল্লামা আবুল ফাতাহ ইবনে জওজী (রঃ) এক নিকট তাফসীর, হাদিম ও ফিকাহ শাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন। অল্প দিনের মধ্যেই তিনি মাদ্রাসার প্রধান ছাত্র হিসাবে পরিগণিত হন এবং মাসিক বৃত্তি লাভ করেন। মাত্র ৩০ বছর বয়সে তিনি তাফসীর, হাদিস, ফিকাহ, সাহিত্য, দর্শন, খোদাতত্ত্ব ও ইসলামের বিবিধ বিষয়ে অসামান্য পান্ডিত্য অর্জন করেন। আল্লামা শেখ সা’দী (রঃ) শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভেই সন্তুষ্ট ছিলেন না; বরং আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের প্রতি ও ছিল তাঁর অস্বাভাবিক আগ্রহ। শেখ সাদী (রঃ) এর জন্মের ১০ বছর পূর্বে অর্থাৎ ১১৬৫ খ্রিঃ (৫৬১ হিঃ) তোপসশ্রেষ্ঠ শেখ আবদুল কাদির জিলানী (রঃ) ইন্তেকাল করেন তাঁর অলৌকিক তপঃ প্রভাবের কথা সমগ্র বিশ্বে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। শেখ সা’দী (রঃ) প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের অবসর সময়ে ধন্য পুরুষদের আশ্রমে গিয়ে অতীন্দ্রিয় জগতের তথ্য সংগ্রহ করতেন। এতদুদ্দেশ্যে তিনি তৎকালীন তপস শেখ শাহাবুদ্দিন (রঃ) এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ধন্য পুরুষদের সঙ্গ লাভে অল্প দিনের মধ্যেই তাঁর ধর্মগত প্রাণ তত্ত্বজ্ঞান  ও পুণ্যের আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল।
৩০ বছর বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্তির পর শুরু হয় তাঁর ভ্রমণ জীবন। জ্ঞান পিপাসা চরিতার্থ করার মানসে সসসংসার বৈরাগীর ন্যায় খালি হাতে তিনি পদব্রজে বিচরণ করেছেন জগতের বিভিন্ন দেশ এবং নানা স্থানে উপদেশ বিতরণের মাধ্যমে লোকদের ধর্ম ও সভ্যতার পথে উন্নীত করেছেন। স্যার আউসলী’র মতে প্রাচ্য জগতে সুবিখ্যাত ইবনে বতুতার পরে পরিব্রাজক হিসেবে যার নাম শীর্ষে রয়েছে, তিনি হলেন মাওলানা শেখ সা’দী (রঃ)। ডদব্রজ বা উষ্ট্রপৃষ্ঠ ব্যতীত যখন মরুভূমি পার হবার কোন উপায় ছিল না তখন শেখ সা’দী  (রঃ) শ্বাপদসঙ্কুল ও অসভ্য বর্বর অধ্যুষিত জনপদের শত সহস্র বিপদ উপেক্ষা করে পদব্রজে ভ্রমণ করেছিলেন দেশ থেকে দেশান্তরে। তিনি সমগ্র পারস্য, এশিয়া মাইনর, আরবভূমি, সিরিয়া, মিসর , জেরুজালেম, আর্মেনিয়া, আবিসিনিয়া, তুর্কিস্তান, ফিলিপাইন, ইরাক, কাশগড়, হাবস, ইয়ামন, শাম, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, হিন্দুস্তানের সোমনাথ ও দিল্লীসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। পদব্রজে ভ্রমণ করেছিলেন। এ সময় দেশ ভ্রমণ করতে গিয়ে তাঁকে পার হতে হয়েছিল পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর, ভারত মহাসাগর, আরব সাগর প্রভৃতি। এ দীর্ঘ সফরের ফলে তিনি বিশ্বের ১৮ টি  ভাষায় পান্ডিত্য অর্জর করেছিলেন। পদব্রজে তিনি হজ্জ সম্পাদর করেছিলেন ১৪ বার। তাঁর এভ্রমণ কাহিনী তিনি তাঁর গুলিস্তা ও বোস্তা বিতাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। গুলিস্তায় তি‍নি ‍লিখেছেন-
“দর আফসায়ে আলম বগাশতাম ব’সে,
বসর বোরদাম আ’য়ামে বহর কা’সে,
তামাত্তায়া যে হরগোশা ইয়াফতাম,
যে হর খিরমানে খোশা ইয়াফতাম।”
অর্থাৎ “ভ্রমিয়াছি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রদেশ,
মিলিয়াছি সর্বদেশে সবাকার সনে,
প্রতি স্থানে জ্ঞানে রেণু করি আহরণ,
প্রতি মৌসুমে শস্য করেছি ছেদন।”
বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের মধ্যে দিয়ে শেখ সা’দী (রঃ) অর্জন করেছিলেন বিবিধ জ্ঞান; তাঁর চোখের সামনে ঘটেছিল বহু বিচিত্র ঘটনা, তিনি অবলোকন করেছিলেন জাতির উণ্থান, পতনের ইতিহাস। কর্ডোভার  মুসলিম সাম্রাজ্য যার ঐশ্বর্যে একদিন এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্যিকা প্রভাবান্বিত হয়েছিল তা ত্রয়োদশ শতাব্দীতে শেখ সা’দী (রঃ) এর চোখের সামনে নিশ্চিহ্ন হয়ে ধরা পৃষ্ট হতে মুছে গিয়েছিল। এ শতকেই সেলজুক এবং খাওয়ারিজম শাহীর আত্মদ্বন্দ্ব উভয় সাম্রাজ্যের মূল উৎপাটন করে ফেলেছিল।  বনি আব্বাসদের রাজ বংশ যা প্রায় সাড়ে পাঁচশ’ বছর বিপুল বিক্রমে রাজত্ব করেছিল, তাও এশতকে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সা’দী (রঃ) দেখেছিলেন দুর্ভিক্ষের হাহাকার। মিসর ও পারস্যের দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ হানি দেখে তাঁর হৃদয় বিদীর্ণ হয়েছিল। যে দুর্ধর্ষ চেঙ্গিস খাঁর নামে আজও সমগ্র এশিয়ার লোক শিহরিত হয়, তারই পোত্র নৃশংস হালাকু খান এক বিরাট তাতার বাহিনী নিয়ে ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদের উপর আপতিত হয়েছিল। বর্বরদের নির্মম আক্রমণে ইসলামের শেষ খলিফা মোতাসেম বিল্লাহ নির্দয় ভাবে নিহত হলেন। এরপর শুরু হল নির্মম গণহত্যার অভিনব। নারী পুরুষের অকলঙ্ক শোণিতে রাজপথ, গৃহ  ও টাইগ্রাসের পানি রঞ্জিত হল। বাগদাদ পরিণত  হল এক মহা শ্মশানে। ইবনে খালদুন লিখেছেন, বিশ লক্ষ অধিবাসীর মধ্যে প্রায়  ষোল লক্ষ লোক এ আক্রমণে নিহত হয়েছিল । শেখ সা’দী (রঃ) গুলিস্তার প্রথম অধ্যায়েই এই সকল জালেমদের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী পরিচালনা করেছেন। তাঁর প্রায় সমগ্র কাব্য গ্রন্থের ভিতরই জালেম বাদশাহর উপর তাঁর শ্লেষ বাক্য ও অবজ্ঞার চিহ্ন বিচ্ছরিত দেখতে পাওয়া যায়।
দেশ ভ্রমণে নিষ্ঠুর, জালেম ও বর্ববদের হাতে সা’দীকে কতবার যে কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। দ্বাদশ শতাব্দীতে ফিলিস্তিনীতে খ্রিস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে ধর্মযুদ্ধ যখন চরম আকার ধারণ করে তখন খ্রিস্টানদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবার জন্যে শেখ সা’দী (রঃ) নিকটস্থ এক নির্জন জঙ্গলে আশ্রয় নেন। খ্রিস্টানগণ জঙ্গল থেকে তাঁকে ধরে নিয়ে যায় এবং বুলগেরিয়া ও হাঙ্গেরী হতে আনীত ইহুদিদের সাথে তাঁকে পরিখা খননে ‍নিযুক্ত করে। তখন তাঁর দুরাবস্থার সীমা ছিল না। একদিন আলিপ্পো শহরের এক সম্ভান্ত বণিক (সা’দীর এক সময়ের পরিচিত) সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। শেখ সা’দী (রঃ) তাঁকে দেখে সমুদয় ঘটনা বললেন। এতে বণিত দয়াপরবশ হয়ে মনিবকে ১০ দিনার ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাঁকে মুক্ত করে সাথে করে আলিপ্পো শহরে নিয়ে যান। কিন্তু আলিপ্পো শহরেও তিনি সুখ পাননি। বণিকের এক বদমেজাজী ও বয়স্কো কন্যা ছিল। তার বদমেজাজের কারণে কেউ তাকে বিয়ে করতে রাজি হত না। বণিক ১০০ দিনার মোহরের বিনিময়ে কন্যাকে শেখ সা’দীর নিকট বিয়ে দেন এবং মোহরের অর্থ বণিক নিজেই পরিশোধ করেন। সা’দী বিপদে আপদে কখনো ধৈর্য্যহারা হতেন না। বিয়ের পর কবি শেখ সা’দী (রঃ) আর সুখের মুখ দেখতে পেলেন না। বদমেজাজী রমণী একদিন সহসা বলে ফেলল যে, তুমি কি সেই হতভাগ্য নও, যাকে আমার পিতা অনুগ্রহ করে ১০ দিনার মূল্য দিয়ে স্বহস্তে মুক্ত করেছিলেন? উত্তরে শেখ সা’দী (রঃ) বললেন, “হ্যাঁ সুন্দরী! আমি সেই হতভাগ্য, যাকে তোমার পিতা ১০ দিনার দিয়ে মুক্ত  করেছিলেন, কিন্তু পুনরায় ১০০ দিনার দিয়ে তোমার দাসত্বে নিযুক্ত করে দিয়েছেন।” সম্ভবত আল্লাহ পাক তার প্রিয় বান্দাদেরকে এভাবে অভার অনটন ও দুঃখ  কষ্ট দিয়ে পরীক্ষা করে থাকেন।
আল্লামা শেখ সা’দী (রঃ) বহু কাব্যগ্রন্থ রচনা করে যান। তাঁর এ সকল কাব্যে রয়েছে মানুষের নৈতিক ও চরিত্র গঠনের অমূল্য বাণী। শেখ সা’দীর অলঙ্কারময় ভাষা ও প্রকাশের জাদু পাঠকদের মনকে বিস্ময় বিমুগ্ধ করে রাখত। আজও তাঁর লেখা কাব্য গ্রন্থ কারিমা, গুলিস্তা ও বোস্তা বিশ্বের বিভিন্ন কওমী মাদ্রাসায় পাঠ্য তালিকার অর্ন্তভুক্ত রয়েছে। মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রীরা পবিত্র কোরআন শিক্ষার পরই তাঁর রচিত কা্ব্য গ্রন্থ কারিমা,গুলিস্তা ও বোস্তা শিক্ষা লাভ করে থাকে। তাঁর সমস্ত রচনাই অতি সরল ও প্রাঞ্জল। আলেমগণ বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় সভায় শেখ সা’দীর কবিতা আবৃত্তি করে থাকেন। তাঁর কবিতা আবৃত্তি না করলে আলেমগণ যেনওয়াজ মাহফিল জমাতে পারেন না। শিশুরা শেখ সা’দীর কারিমা গ্রন্থের কবিতা সুললিত কণ্ঠে পাঠ করতে থাকে-  “কারিমা ব-বখশায়ে বর হালে মা
কে হাস্তম আসীরে কামান্দে হাওয়া।
না দারেম গায়ের আযতু ফরিয়াদ রাস
তু-য়ী আসীয়াঁরা খাতা বখশ ও বাস।
নেগাহদার মা’রা যে রাহে খাতা
খাতা দার গোযার ও সওয়াবম নমা।”
অনুবাদ- হে দয়াময় প্রভু ! আমার প্রতি রহম কর। আমি কামনাও  বাসনার শিবিরে বন্দী। তুমি ব্যতীত আর কেউ নেই , যার নিকট আমি প্রার্থনা করব। তুমি ব্যতীত আর কেউ ক্ষমাকারী নেই। তুমি আমাকে পাপ থেকে রক্ষা কর। আমার কৃত পাপ ক্ষমাকরে পুণ্যের পথ প্রদর্শন কর।
শেখ সা’দীর গুলিস্তা ও বোস্তা বিশ্ব কাব্য ও  সাহিত্যে এক অমূল্য সম্পদ।গুলিস্তা ও বোস্তা ব্যতীত জগতে এমন গ্রন্থ খুব কমই আছে যা বহু যুগ ধরে বিপুল ভাবে পঠিত হয়ে আসছে। ১৬৫১  খ্রিস্টাব্দে জেল্টায়াস নামক এক ব্যক্তি ল্যাটিন ভাষায় আমস্টারডাম নগরে ‘ রোসারিয়াম পলিটিকাম’ নাম দিয়ে গুলিস্তার অনুবাদ প্রকাশ করেন। ১৭৪৭ খ্রিস্টাব্দে উহা ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়। বর্তমানে ইউরোপ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখ সা’দীর গুলিস্তাসহ বিভিন্ন কিতার ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, আরবী, ডাচ,উর্দূ, তুর্কি, বাংলঅ প্রভৃতি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। শেখ সা’দী (রঃ) এর উপরোক্ত গ্রন্থগুলো ব্যতীত ‘ নসিহত-অল-মলুক,’ ‘রিসালায়ে সাহেবে দিউয়ান,’ ‘কাসায়েদল আরবী,’ ‘আৎ তবিয়াত,’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
শেষ বয়সে শেখ সা’দী (রঃ) মাতৃভিূমি নগরের এক নির্জন আশ্রমে জীবন যাপন করতেন। এ স্থানেই তিনি অধিকাংশ সময় গভীর ধ্যানমগ্ন থাকতেন। মাঝে মাঝে আগন্তক ব্যক্তিদের সাক্ষাৎ দেয়ার জন্যে আশ্রমো বাইরে যেতেন। দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন ধনী, গরীব, শিক্ষিত, মূর্খ, রাজা প্রজা এবং নিকট সমবেত হত। শেখ সা’দী (রঃ) বাল্যকাল থেকেই দৈনিক ৪/৫ঘণ্টা পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করতেন। তিনি কখনো গৃহে বেনামাজী চাকর নিয়োগ করতেন না। আস্তে আস্তে তাঁর বাধর্ক্য ঘনিয়ে আসে। বার্ধক্যেও তিনি যৌবনের তেজ ধারণ করতেন। অবশেষে ১২৮২ খ্রিস্টাব্দমোতাবেক ৬৯১ হিজরীতে ১২০ বছর বয়সে এ মনীষী ইহলোক ত্যাগ করেন। সিরাজ নগরের ‘দিলকুশা’ নামক স্থানের এক মাইল পূর্ববর্তী পাহাড়ের নিচে তাঁর সমাধি রয়েছে। সমাধি জিয়ারতকারীদের পাঠের জন্যে সা’দীর নিজ হাতে লেখা একটি কাব্যগ্রন্থ সমাধি গৃহে রক্ষিত আছে। পারস্যে এ সমাধি গৃহ ‘সাদীয়া’ নামে অভিহিত হয়ে থাকে।

পিথাগোরাস[৫৮০-৫০০]

গণিতশাস্ত্রের ইতিহাসে যিনি আদিপুরুষ হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছেন তাঁর নাম পিথাগোরাস। তিনি ছিলেন একাধারে গণিতজ্ঞ চিন্তাবিদ দার্শনিক। প্রায় আড়াই হাজার বছন আগে বর্তমান তুরস্কের পশ্চিমে ইজিয়ান সাগরের সামস  দ্বীপে পিথাগোরাসের জন্ম। এই সামস ছিল গ্রীসের ক্রোতনা দ্বীপের অন্তর্ভুক্ত। ছেলেবেলা থেকেই বিদ্যা অনুরাগের প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল পিথাগোরাসের। তিনি বিশ্বাস করতেন কোন একদজন শুরুর কাছে জ্ঞান সম্পূর্ণ হয় না। জ্ঞানের ভান্ডার ছড়িয়ে আছে পৃথিবীব্যাপী। তাই সামস শহরে তাঁর শিক্ষা শেষ করে বার হলেন দেশভ্রমণে। সেই সময় গ্রীস দেশের বাণিজ্যতরীগুলি বিভিন্ন দেশে বাণিজ্য করতে যেত। এমনি একটি জাহাজে করে তিনি রওনা হলেন মিশরে। প্রাচীন গ্রীসের মত প্রাচীন মিশরও ছিল জ্ঞান- বিজ্ঞার চর্চার কেন্দ্রভূমি। এখানে প্রধানত গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের শিক্ষালাভ করেন।
মিশরে অবস্থানের সময় পিরমিড দর্শন করে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যান। বিশাল পিরামিড নির্মাণের সময় যে গাণিতিক নিয়ম অনুসারে পাথরগুলিকে সাজান হয়েছিল তা থেকেই সম্ভবত তাঁর মনে প্রথম জ্যামিতির সম্বন্ধে চিন্তা- ভাবনা জেগে ওঠে। যদিও জ্যামিতির জনক ইউক্লিড, (আনুমানিক ৩২০-২৭৫ খ্রিস্টপূর্ব) । তিনিই প্রথম জ্যামিতির জন্য সুসংহতভাবে নির্দিষ্ট পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। এরই পরিণতি তাঁর বিখ্যাত উপপাদ্যটি সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের উপর অঙ্কিত বর্গ ওই ত্রিভুজের অপর দুই বাহুর উপর বর্গের যোগফলের সমান।
এই বিষয়ে ভিন্ন মত প্রচলিত আছে। পিথাগোরাস দেশভ্রমণ করতে করতে ভারতবর্ষে এসে উপস্থিত হন। প্রাচীন মিশরের মত প্রাচীন ভারতবর্ষও ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রভূমি। পিথাগোরাসের আবির্ভাবের অন্তত একশ বছর ভারতীয় পন্ডিত বৌধয়ন জ্যামিতি সম্বন্ধে চিন্তা- ভাবনা শুরু করেন। সম্ভবত তাঁর কোন সূত্র থেকে পিথাগোরাস এই উপপাদ্যটি রচনা করেন। কোন সূত্র থেকে তিনি এই রচনাটি করেছিলেন তা জানা না গেলেও এটি যে তার মৌলিক রচনা এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
বিবাহ ও বন্ধু নির্বাচনের সময় তিনি সংখ্যার খু্বই গুরুত্ব দিতেন। শোনা যায় কোন এক যুবরাজ তাঁর মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। বিবাহের সময় তিনি গণনা করে দেখলেন তাঁর নামের সংখ্যা ২৮৪। ‍তিনি ঘোষণা করলেন যে কন্যার নামের সংখ্যা হবে ২২০, সেই হবে তাঁর আদর্শ স্ত্রী। তবে পিথাগোরাস তাঁর নিজের বিবাহের সময় এই সংখ্যার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেননি। তিনি তাঁরই এক ছাত্রী থিয়ানোকে বিবাহ করেছিলেন। থিয়ানো শুধু তাঁর যোগ্য ছাত্রী ছিলেন তাই নয়, তিনি ছিলেন আদর্শ স্ত্রী। থিয়ানোর গর্ভে পিথাগোরাসের একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তার নাম ড্যামো । ড্যামো ছিলেন পিতার মতই পন্ডিত দার্শনিক। পিথাগোরাস সমস্ত জীবন ধরে  যা কিছু রচনা করেছিলেন তা গুপ্ত রাখবার জন্য কন্যাকে নিদের্শ দিয়ে যান। আমৃত্যু কন্যা সেই নিদের্শ পালন করেছিল।
সংগীতের সঙ্গে সংখ্যার যে নিবিড় সম্পর্কূ –অর্থাৎ সংগীতের সাথে তাল ও লয়ের যে ঐক্য –তা পিথাগোরাসেই আবিস্কার। এই প্রসঙ্গে একটি কাহিনী প্রচলিত আছে। তিনি একদিন রাজপথ দিয়ে হাঁটছিলেন, পথের ধারে এক কামারের দোকান। অকস্মাৎ তাঁর কানে এল হাতুড়ি ঠোকার শব্দ। একটি শব্দের সাথে আরেকটি শব্দের কোন ঐক্য খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি দোকানে সব কটি হাতুড়ি ওজন করে দেখলেন – তাদের ওজন হল ৬, ৮,৯,৭, এই সংখ্যাগুলির সম্পর্ক নির্ণয় করলেন (২*৩) অর্থাৎ ৬ (২*৪)=৮  (৩*৩)=৯। এই তিনটি হাতুড়ির আওয়াজের মধ্যে মিল খুঁজে পেলেন কিন্তু চতুর্থ হাতুড়িটির ওজন ছিল সামঞ্জস্যহীন, তাই তার আওয়াজও ছিল বেসুরো।
সংগীত ও ঔষধের মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক খুজেঁ বার করেছিলেন পিথাগোরীয়ানরা। তাঁদের মতে মানুষের দেহও বাদ্যবন্ত্রের মত নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত। সংগীতের উচ্চ স্বর নিম্ন স্বরের মতই দেহ কখনো শীতন কখনো উত্তপ্ত হয়। নির্দিষ্ট সুরে যখন বাদ্যযন্ত্র বাঁধা থাকে তখনই তার থেকে সংগীতের উদ্ভর হয়। মানব দেহ যদি যন্ত্রের তারের মত চড়া পর্দায় বাঁধা হয় কিম্বা টান শিথিল হয়ে পড়ে কখন শরীরে নানান রোগের উদ্ভব হয়। স্বাস্থ্য বিষয়ে তাঁর বহু বক্তব্য আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
পিথাগোরাসই প্রথম বলেছিলেন পৃথিবীর আকার গোল। আমাদের চারপাশের গ্রহ-নক্ষত্র এই পৃথিবী আবর্তিত হচ্ছে। কোপার্নিকাস তাঁর রচনায় অপকটে পিথাগোরাসের কাছে ঋণ স্বীকার করেছেন। প্রাচীন ভারতীয় ঋষিদের মত পিথাগোরাস জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন আত্মা অমর-তার লয় নেই । মৃত্যুর পর আত্মা নতুন দেহে জন্ম নেয়। একদিন পিথাগোরাস দেখলেন একটি লোক কুকুরটিকে মারছে। যন্ত্রণায় কুকুরটি চিৎকার করছে। কুকুরটির চিৎকারে বিচলিত হয়ে পড়লেন পিথাগোরাস। তাঁর মনে হলঐ কন্ঠস্বর তাঁর মৃত বন্ধুর। মৃত্যুর পর সে কুকুর হয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। গণিতে তাঁর অবদানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে হেরোক্লিটাস স্বীকার করেছেন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অন্য সকলকে তিনি অতিক্রম করে গিয়েছেন। ধর্ম  বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নির্ণয়ের প্রসঙ্গে তিনি বলতেন, বিজ্ঞানের মধ্যেই আছে সর্বশ্রেষ্ঠ বিশুদ্ধতা এবং যে মানুষ এই বিশুদ্ধতাতেই নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন তিনিই শ্রেষ্ঠ দার্শনিক। অ্যারিস্টটল তাঁর প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, “পিথাগোরাসই প্রথম পাটিগণিতকে বাণিজ্যিক প্রয়োজনের সীমারেখার গণ্ডি অতিক্রম করে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছিলেন। তিনি ত্রিভুজের ব্যবহার জানতেন এবং ৩, ৪, ৫ সংখ্যার সাহায্যে সমকোণী ত্রিভুজ অঙ্কন করতে জানতেন। পরবর্তীকালে এটি পিথাগোরীয় ত্রিভুজ নামে পরিচিত হয়।
জীবনকালে গ্রীস দেশে পিথাগোরাসের জনপ্রিয়তা ছিল বিরাট। তাঁর ছাত্র শিষ্য ছাড়াও দেশের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি তাঁর  পান্ডিত্যের জন্য তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা করত। ক্রমশই পিথাগোরাসের অনুগামীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাদের মধ্যে অনেকে জ্ঞানচর্চার চেয়ে রাজনীতির চর্চায় বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে। দেশের রাজশক্তি এতে চিন্তিত হয়ে ওঠে। তাছাড়া কিছু বুদ্ধিজীবীও পিথাগোরাসের খ্যাতির জনাপ্রয়তা সম্মানে ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেছিল। তারা রাজশক্তির সাথে একত্রিত হয়ে পিথাগোরাসের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার করতে আরম্ভ করল। এই প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে জনসাধারণ পিথাগোরাস্ শিক্ষাকেন্দ্র আক্রমণ করল। পিথাগোরাসের শিষ্য যারা বাধা দিতে এল তারা মারা পড়ল, অনেকে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাল।
শিষ্যদের অনুরোধে পিথাগোরাসও পালাতে আরম্ভ করলেন। তিনি বিক্ষুব্ধদের প্রায় নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিলেন। হঠাৎ সামনে পড়ল কলাই জাতীয় এক শস্যের ক্ষেত। তিনি ইচ্ছে করলেই ক্ষেতের উপর দিয়ে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তিনি বিশ্বাস করতেন-কলাইয়েরও প্রাণ আছে। একটি জীবন্ত কলাইয়ের উপর পা দেওয়ার অর্থ একটি জীবনকে হত্যা করা। নিজের জীবর বিপন্ন জেনেও কলাইয়ের উপর পা রাখলেন না। সেই সুযোগে বিপক্ষ দলের লোকেরা এসে তাঁকে হত্যা করল। নিজের জীবন দিয়ে নিজের আদর্শকে রক্ষা করলেন পিথাগোরাস।

MKRdezign

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget