Latest Post


স্যার আইজাক নিউটন
(১৬৪২-১৭২৭)

১৬৪২ সালের বড়দিনে আইজাক নিউটন জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের কয়েক মাস আগেই পিতার মৃত্যু হয়। জন্মের সময়ে আইজাক ছিলেন দুর্বল শীর্ণকায় আর ক্ষুদ্র আকৃতির, তাই তাঁর জীবনের আশা সম্পূর্ণ ত্যাগ করেছিল তাঁর পরিবার। হয়ত বিশ্বের প্রয়োজনেই বিশ্ববিধাতা তাঁর প্রাণরক্ষা করেছিলেন।
বিধবা মায়ের সাথেই নিউটনের জীবনের প্রথম তিন বছর কেটে যায়। এই সময় তাঁর মা বারনাবাস নামে এক ভদ্রলোকের প্রেমে পড়ে তাকে বিবাহ করেন। নব বিবাহিত দম্পতির জীবনে শিশু নেহাতই অবাঞ্ছিত বিবেচনা করে মা শিশু নিউটনকে তাঁর দাদির কাছে রেখে দেন।
১২ বছর বয়সে নিউটনকে গ্রামের স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হল। জন্ম থেকেই রুগ্ন ছিলেন নিউটন। তবু তাঁর দুষ্টুমি কিছু কম ছিল না। কিন্তু শিক্ষকরা তাঁর অসাধারণ মেধার জন্য সকলেই তাঁকে ভালবাসতেন।
স্কুলের অধ্যক্ষের শালা প্রায়ই স্কুলে পৌঁছাতে দেরি করত। একদিন নিউটন বললেন, স্যার, আমি আপনার জন্য একটা ঘড়ি তৈরি করে দিচ্ছি, তাহলে ঘড়ি দেখে ঠিক সময়েই স্কুলে আসতে পারবেন। নিউটন ঘড়ি তৈরি করলেন। ঘড়ির উপরে থাকত একটা পানির পাত্র। প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি সেই পাত্রে ঢেলে দেওয়া হত। তার থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঘড়ির কাটার উপর পড়ত এবং ঘড়ির কাটা আপন গতিতেই এগিয়ে চলত।
ভাগ্যের পরিহাসে নিউটনের সৎ বাবা মারা গেলেন। মার একার পক্ষে ক্ষেত জমিজমা দেখাশুনা করা সম্ভব হল না। স্কুল ছাড়িয়ে চৌদ্দ বছরের নিউটনকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে এলেন।
ভাগ্যক্রমে চাচা উইলিয়াম ভাইপোর জ্ঞানতৃষ্ণায় মুগ্ধ হয়ে নিজের কাছে নিয়ে এলেন। চাচা কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ভাইপোকে আবার স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। এক বছর পর নিউটন ট্রিনিটি কলেজে ভর্তি হলেন। শুরু হল এক নতুন জীবন।
ছাত্র হিসেবে নিউটন ছিলেন যেমন অধ্যাবসায়ী, পরিশ্রমী তেমনি অসাধারণ মেধাসম্পন্ন। তাঁর সবচেয়ে বেশি দখল ছিল অঙ্কে। যে কোন জটিল অঙ্কের সমাধান সহজেই করে ফেলতেন। তবুও অঙ্কের প্রতি তাঁর কোন আকর্ষন ছিল না। প্রকৃতির দুর্জ্ঞেয় রহস্য তাঁকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করত। নিউটন বিশ্বাস করতেন একমাত্র বিজ্ঞানের মাধ্যমেই প্রকৃতির এই গোপন রহস্যকে উদঘাটন করা সম্ভব। অবশেষে ১৬৬৫ সালে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করলেন।
কলেজে ছাত্র থাকাকালীন অবস্থাতেই তিনি অঙ্কশাস্ত্রের কিছু জটিল তথ্যের আবিষ্কার করেন—বাইনমিয়াল থিওরেম (Binomial theorem), ফ্লাক্সসন (Fluxions), যা বর্তমানে ইণ্টিগ্রাল ক্যালকুলাস (Interegal Calculus) নামে পরিচিত। এ ছাড়া কঠিন পদার্থের ঘনত্ব (The method for Calculating the area of curves or the volume of solids) । ১৬৬৬ সাল-এই সময় নিউটন একটি চিঠিতে লিখেছেন আমি Fluxions পদ্ধতি উদ্ভাবনের সাথে সাথেই মাধ্যার্কষণ শক্তির সম্বন্ধে চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করেছি। ভাবতে অবাক লাগে তখন নিউটনের বয়স মাত্র চব্বিশ।
নিউটন চাঁদ ও অন্য গ্রহ-নক্ষত্রের গতি নির্ণয় করতে সচেষ্ট হন। কিন্তু তাঁর উদ্ভাবিত তত্ত্বের মধ্যে কিছু ভূল-ত্রুটি থাকার জন্য তাঁর প্রচেষ্টা অসম্পূর্ণ ও ভূল থেকে যায়।
এই সব অসাধারণ কাজ ও মৌলিক তত্ত্বের জন্য সেই তরুণ বয়সেই নিউটনের খ্যাতি পণ্ডিত মহলে ছড়িয়ে পড়ল। ১৬৬৭ সালে তাঁর কৃতিত্বের জন্য ট্রিনিটি কলেজ তাঁকে ফেলো হিসেবে নির্বাচন করলেন। একজন ২৫ বছরের তরুণের পক্ষে এ এক দুলর্ভ সম্মান।
এইবার তিনি আলোর প্রকৃতি ও তার গতিপথ নিয়ে গবেষণার কাজ শুরু করলেন এবং এই কাজের প্রয়োজনেই তিনি তৈরি করলেন প্রতিফলক টেলিস্কোপ (Reflecting telescope) । পরবর্তীকালে মহাকাশ সংক্রান্ত গবেষণার প্রয়োজনে যে উন্নত ধরণের টেলিস্কোপ আবিষ্কৃত হয়, তিনিই তাঁর অগ্রগামী পথিক।
নিউটন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রিনিটি কলেজের গণিতের অধ্যাপক হিসেবে নির্বাচিত হলেন। সেই সাথে আলোর বর্ণচ্ছটা নিয়ে গবেষণার কাজ আরম্ভ করলেন। ইংল্যাণ্ডের রয়াল সোসাইটিও নিউটনের বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত করলেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৯। ইংল্যাণ্ডের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের পাশে তাঁর স্থান হল। সোসাইটির প্রথম সভায় তাঁর আলোকতত্ত্ব নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ করলেন। তাঁর বিষয়বস্তুর সঙ্গে একমত হতে না পারলেও সোসাইটির সমস্ত বিজ্ঞানীই উচ্চকণ্ঠে তাঁর বৈজ্ঞানিক নিবন্ধের প্রশংসা করলেন। তিনি যেন এক আত্মমগ্ন সাধক। নিজের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছেন। নিজের বেশবাস সাজগোজ কোন দিকেই ভ্রুক্ষেপ নেই। প্রায়ই দেখা যেত তিনি কলেজে আসছেন, তাঁর জামার বোতাম খোলা, পায়ের মোজা গুটিয়ে আছে, এলোমেলো চুল। তন্ময় হয়ে চলেছেন কোন নতুন বৈজ্ঞানিক ভাবনায় বিভোর।
কল্পনাপ্রবণ এই মনের জন্যই বাস্তব জগৎ সম্বন্ধে তাঁর ধারণা ছিল অস্পষ্ট। একদিন একজন লোক তাঁর বাড়িতে এসে একটা প্রিজম (তিনকোণা কাঁচ) দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল এর কত দাম হতে পারে? প্রিজমের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব বিবেচনা করে নিউটন বললেন, এর মূল্য নির্ণয় করা আমার সাধ্যের বাইরে। লোকটি নিউটনের কথা শুনে অস্বাভাবিক বেশি দামে প্রিজমটি বিক্রি করতে চাইল। কোন দরদাম না করেই সেই দামে প্রিজমটি কিনে নিলেন নিউটন। নিউটনের বাড়িওলা সব কথা শুনে বললেন, তুমি নেহাতই বোকা। এটা সাধারণ একটা কাঁচ, এই কাঁচের যা ওজন হবে সেই দামেই এটা কেনা উচিত ছিল।
নিউটন কোন কথা না বলে শুধু হাসলেন। পরবর্তীকালে এই প্রিজম থেকেই উদ্ভাবন করেন বর্ণতত্ত্ব (theory of colour)
কলেজের ছুটির অবকাশে মায়ের কাছে গিয়েছেন নিউটন। দিনের বেশির ভাগ সময়ই বাগানের মধ্যে বসে থাকেন। প্রাণ ভরে উপভোগ করেন প্রকৃতির রুপ রস গন্ধ। একদিন হঠ্যাৎ সামনে খসে পড়ল একটা আপেল। মুহূর্তে তাঁর মনের কোণে উঁকি মারে এক জিজ্ঞাসা-কেন আপেলটি আকাশে না উঠে মাটিতে এসে পড়ল? এই জিজ্ঞাসাই মানুষের চিন্তার জগতে এক যুগান্তর নিয়ে এল। জন্ম নিল মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্বের।যদিও এই চিন্তার সূত্রপাত হয়েছিল বহু পূর্বেই। তাঁর পূর্ণ পরিণতি ঘটল ১৬৮৭ সালে। নিউটন প্রকাশ করলেন তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ (Mathematical Principles of Natural Philosophy ) । মানুষ মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কথা সামান্য কিছু জানলেও এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে রয়েছে যে তার অস্তিত্ব সে কথা কেই জানত না। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির এই আকর্ষণ গ্রহ নক্ষত্র পৃথিবীকে একসূত্রে বেধে রেখেছেন।
একদিন রাতে এক বন্ধুর বাড়িতে তাঁর নিমন্ত্রণ হয়েছে। কাজ করতে করতে রাত হয়ে গিয়েছে। হঠ্যাৎ তাঁর মনে পড়ল বন্ধুর বাড়িতে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বার হলেন নিউটন। যখন বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলেন তখন গভীর রাত। চারদিক অন্ধকার। নিউটন বুঝতে পারলেন নিমন্ত্রণ পর্ব আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে। বাড়ি ফিরে এসে আবার কাজে বসলেন। রাতে খাওয়ার কথা মনেই হল না তাঁর।
এই নিরলস গবেষণার মধ্যে দিয়েই নিউটন প্রমাণ করলেন, If the force varied as the inverse square, the orbit would be an ellipse with the center of the force in one focus—এই আবিষ্কারের মাধ্যমে মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার কাজ সহজসাধ্য হল। এতদিন মানুষের জানা ছিল না চন্দ্র-সূর্যের সঠিক আয়তন, নিউটন তা নির্ণয় করলেন।
প্রতিষ্ঠা হল মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব-এই তত্ত্বের যাবতীয় বিবরণ তিনি লিখলেন তাঁর প্রিন্সিপিয়া গ্রন্থটিতে (Principia Mathematical) । যখন এই বই প্রকাশিত হল তখন অধিকাংশ মানুষের কাছেই মনে হল এই বই যেমন জটিল তেমনি দুর্বোধ্য। নিউটনের এক দার্শনিক বন্ধু একদিন নিউটনকে জিজ্ঞাসা করলেন, কিভাবে তোমার লেখার অর্থ বোঝা সম্ভব।
নিউটন তাকে একটি বই-এর তালিকা দিয়ে বললেন, আপনি আগে এই বইগুলো পড়েন তাহলে আমার তত্ত্ব-বোঝার কাজ সহজ হবে। ভদ্রলোক তালিকাটি দেখে বললেন, নিউটনের তত্ত্ব বোঝা আমার সাধ্যের বাইরে। কারণ প্রাথমিক তালিকার এই কটি বই পড়া শেষ করতেই আমার অর্ধেক জীবন কেটে যাবে।
Philosophic naturalist Principia Mathematic প্রকাশিত হয় ১৬৪৭ সালে। ল্যাটিন ভাষায় লেখা এই বইটি তিনটি খণ্ডে বিভক্ত।
প্রথম খণ্ডে নিউটন গতিসূত্র সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন। তিনটি গতিসূত্র হল, (১) প্রত্যেকটি বস্তু চিরকাল সরল রেখা অবলম্বন করে সমবেগে চলতে থাকে। (২) বস্তুর উপর প্রযুক্ত বল বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের হারের সমানুপাতিক এবং বল যেদিকে ক্রিয়া করে, ভরবেগের পরিবর্তনও সেদিকে ঘটে। (৩) প্রত্যেকটি ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।
প্রিন্সপিয়া গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে তিনি গ্যাস, ফ্লুইড বস্তুর গতির কথা আলোচনা করেছেন। গ্যাসকে কতকগুলো স্থিতিস্থাপন অণুর সমষ্টি ধরে নিয়ে তিনি বয়েলের সূত্র প্রমাণ করেন। গ্যাসের উপর চাপের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পরোক্ষভাবে শব্দ তরঙ্গের গতিবেগও নির্ধারণ করেন। তাঁর এই তত্ত্বে কিছু ভূল-ক্রুটি সংশোধন করেন। তৃতীয় খণ্ডে মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব সম্বন্ধে খুঁটিনাটি আলোচনা করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবেই সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহগুলো ঘুরছে। তেমনি পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে চাঁদ। দুটি বস্তুর মধ্যে মহাকর্ষীরা বল তাদের ভরের সমানুপাতিক ও দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপতিক। পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব পৃথিবীর ব্যাসার্ধের ৬০ গুণ। এই দূরত্ব থেকে চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। নিউটন লক্ষ্য করেছিলেন সূর্য ও গ্রহগুলোর মধ্যে প্রত্যেকটি গ্রহ ও তাদের উপগ্রহগুলোর মধ্যে পৃথিবীর সমুদ্র ও চাঁদ এবং সূর্যের মধ্যে এমনকি জোয়ার-ভাটা ও সাধারণভাবে জগতের যে কোন দুটি বস্তুর মধ্যে একই মহাকর্ষ তত্ত্ব কার্যকরী। এছাড়াও তিনি আরো একটি সমস্যার সমাধান করেছিলেন। তিনি প্রমাণ করলেন একটি সমরুপ গোলাকার বস্তুর ভেতরের প্রতিটি কণা যদি বাইরের একটি কণাকে মাধ্যাকর্ষণ বলের সূত্র অনুসারে আকর্ষণ করে তাহলে বাইরের কণাটির উপর যে বল কাজ করবে সেটি এমন হবে যেন গোলাকার বস্তুটির সমস্ত ভর তার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত।
তাঁর প্রতি সমালোচনা করা হল, তিনি তাঁর তত্ত্বে বিশ্বপ্রকৃতিকে যেভাবে বিবেচনা করেছেন তা থেকে মনে হয় এ সমস্ত্ব যেন এক বিশৃঙ্খল মনের প্রাণহীন সৃষ্টির কাহিনী।
নিউটন তাঁর জবাবে বললেন, প্রকৃতপক্ষে এই বিশ্বপ্রকৃতি এমন সুশৃঙ্খল সুমাসঞ্জস্যভাবে সৃষ্টি হয়েছে মনে হয় এর পশ্চাতে কোন ঐশ্বরিক স্রষ্টা রয়েছেন।
নিউটনের এই বিচিত্র মানসিকতার জন্য কোন মানুষই তাঁকে সহজভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি। হয়ত নিজেই নিজের বিরাটতত্ত্বকে সঠিকভাবে চিনতে পারেনন। অসাধারণ আবিষ্কারের পরও তিনি ছিলেন অসুখী মানুষ।
Principia প্রকাশের পরই নিউটন সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে নামলেন। যখন দ্বিতীয় জেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাইলেন, তিনি তার সক্রিয় বিরোধী হয়ে উঠলেন। রাজপরিবারের উৎখাতের পর ১৬৯৪ সালে নতুন সংবিধান তৈরির জন্য যে কনভেনশন গড়ে উঠল, নিউটন তার সদস্য হলেন।
রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন নিউটন। ১৬৯০ সালে কনভেনশনের পরিসমাপ্তি ঘটল, নিউটনের রাজনিতিক জীবনেরও পরিসমাপ্তি ঘটল।
১৭০৩ সালে নিউটনের জীবনে এলো এক অভূতপূর্ব সম্মান। তিনি রয়াল সোসাইটির সভাপতি হলেন। আমৃত্যু তিনি সেই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
১৭০৫ সালে রানী এ্যানি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন। রানীর পক্ষ থেকে নিউটনকে নাইটহুড উপাধিতে ভূষিত করা হল। এই সময় ডিফারে-ন্সিয়াল ক্যালকুলাস (Differential Calculus)-এর প্রথম আবিষ্কর্তা হিসেবে জার্মান দার্শনিক লিবনিজ (Leibniz/Leibnitz)-এর সাথে বিতর্ককে জড়িয়ে পড়লেন। ইংল্যাণ্ডের রয়াল অ্যাকাডেমি জানতে পারে লিবনিজ Differential Calculus -এর আবিষ্কর্তা হিসেবে দাবি জানাচ্ছেন। রয়াল একাডেমির সদস্যরা ক্রোথে ফেটে পড়ল। তাদের সভাপতির কৃতিত্বকে এক বিদেশী চুরি করে নিজের নামে প্রচার করতে চাইছে। কারণ তারা বিশ্বাস করতেন নিউটনই প্রথম-এর সম্ভাবনা, তার অস্তিত্ব সম্বন্ধে লিবনিজের কাছে বলেছিলেন। লিবনিজ একে উন্নত করেছে, সঠিক বিস্তৃতি দিয়েছে কিন্তু আবিষ্কার করেনি।
তবে নিরপক্ষ ঐতিহাসিকদের মতে নিউটন ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাসের উদ্ভাবক হলেও লিবনিজের পদ্ধতি ছিল অনেক সহজ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ। ১৭২৭ সাল, নিউটন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। চিকিৎসার কোন সুফল পাওয়া গেল না। অবেশষে ২০শে মার্চ মহাবিজ্ঞানী নিউটন তাঁর প্রিয় অনন্ত বিশ্বপ্রকৃতির বুকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেন। সাত দিন পর তাকে ওয়েস্ট মিনিস্টার এ্যাবিতে সমাধিস্থ করা হল।
সমস্ত দেশ অবনত মস্তকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানায় সর্বকালে সর্বশ্রেষ্ঠ এই জ্ঞানতাপসকে। যদিও নিজেকে তিনি কখনো পণ্ডিত বা জ্ঞানী ভাবেননি। মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে তিনি লিখেছিলেন, “পৃথিবীর মানুষ আমাকে কি ভাবে জানি না, কিন্তু নিজের সম্বন্ধে আমি মনে করি আমি একটা ছোট ছেলের মত সাগরের তীরে খেলা করছি আর খুঁজে ফিরেছি সাধারণের চেয়ে সামান্য আলাদা পাথরের নুড়ি বা ঝিনুকের খোলা। সামনে পড়ে রয়েছে অনাবিষ্কৃতি বিশাল জ্ঞানের সাগর”।


ক্রিস্টোফার কলম্বাস
[১৪৫১-১৫০৬]

ইতালির জেনোয়া শহরে কলম্বাসের জন্ম। সঠিক দিনটি জানা যায় না। তবে অনুমান ১৪৫১ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবরে, এর মধ্যে কোন এক দিনে জন্ম হয়েছিল কলম্বাসের। বাবা ছিলেন তন্তুবায়। কাপড়ের ব্যবসা ছিল তার। সেই সূত্রেই কলম্বাস জানতে পেরেছিলেন প্রাচ্য দেশের উৎকৃষ্ট পোশাক, নানান মশলা, অফুরন্ত ধনসম্পদের কথা।
সেই ছেলেবেলা থেকেই মনে মনে স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে জাহাজ নিয়ে পাড়ি দিবেন ভারতবর্ষে জাহাজ বোঝাই করে বয়ে নিয়ে আসবেন হীরে মণি মুক্তা মাণিক্য।
কলম্বাস ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী, অধ্যাবসায়ী। কিন্তু অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে ভাগ্য ছিল নিতান্তই প্রতিকূল। তাই অতিকষ্টে জীবন ধারণ করতেন কলম্বাস। কলম্বাসের ভাই তখন লিসবন শহরে বাস করতেন। ভাই-এর কাছ থেকে ডাক পেয়ে কলম্বাস লিসবন শহরে গিয়ে বাসা বাধলেন। কলম্বাসের বয়স তখন আটাশ বছর।
অল্পদিনের মধ্যেই ছোটখাট একটা কাজো জুটে গেল। কাজের অবসরে মাঝে মাঝে গীর্জায় যেতেন। একদিন সেখানে পরিচয় হল ফেলিপা মোঞিসা দ্য পেরেস্কেল্লো নামে এক তরুণীর সাথে। ফেলিপার বাবা বার্থলোমিউ ছিলেন সম্রাট হেনরির নৌবাহিনীর এক উচ্চপদস্থ অফিসার।
কলম্বাসের জীবনে এই পরিচয় এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পরিচয় পর্ব অল্পদিনেই অনুরাগে পরিণত হল। তারপর বিবাহ। বিবাহের পর কলম্বাস শ্বশুরের গৃহেই থাকতেন। শ্বশুরের কাছে শুনতেন তার প্রথম যৌবনের সমুদ্র অভিযানের সব রোমাঞ্চকর কাহিনী। অন্য সময় লাইব্রেরী ঘরে বসে পড়তেন দেশ-বিদেশের নানান ভ্রমণ কাহিনী। এই সময়ে একদিন তার হাতে এল মার্কো পেলার চীন ভ্রমণের ইতিবৃত্ত। পড়তে পড়তে মনের মধ্যে প্রাচ্য দেশে যাবার স্বপ্ন নতুন করে জেগে উঠল।
এর পেছনে কাজ করছিল দুটি শক্তি। রোমাঞ্চকর অভিযানের দূরন্ত আকাঙ্ক্ষা, দ্বিতীয়ত স্বর্ণতৃষ্ণা। তখন মানুষের ধারণা ছিল প্রাচ্য দেশের পথে ঘাটে ছড়ি০য়ে আছে সোনা-রুপা। সে দেশের মানুষেরভূগোলবিদ কাছে তার কোন মূল্যই নেই। ইচ্ছা করলেই তা জাহাজ বোঝাই করে আনা যায়।
কলম্বাস চিঠি লিখলেন সে যুগের বিখ্যাত pagolo Toscanelliss কে। pagolo কলম্বাসের চিঠির জবাবে লিখলেন— “তোমার মনের ইচ্ছার কথা জেনে আনন্দিত হলাম। আমার তৈরি সমুদ্র পথের একটা নকসা পাঠালাম। যদিও এই নকশা নির্ভূল ,তবুও এই নকশার সাহায্যে প্রাচ্যের পথে পৌছাত পরবে।যেখানে ছাড়িয়ে আছে অফুরন্ত হীরা জহরৎ সোনা রুপা মণি মুক্তা মানিক্য।
এই চিঠি পেয়ে কলম্বাসের মন থেকে সব সংশয় সন্দেহ দুর হয়ে গেল।শুরু হয়ে গেল তার যাত্রা প্রস্তুতি।কলম্বাসের ইচ্ছার কথা শুনে সকলে অবাস্তব অসম্ভব বলে উড়িয়ে দেয়।অনেকে তাকে উপহাস করল।কেউ কেউ তাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রপ করতেও ছাড়লো না।একটি মানুষও তার সামর্থনে বা সাহায্যে এগিয়ে এল না।
কলম্কাসের অনুরোধে স্পেনের রাণী ইসাবেলা সহ্দদয় বিবেচনার আশ্বাস দিলেও সম্রাট ফার্দিনান্দ সরাসরি প্রত্যাখান করলেন।ইতিমধ্যে কলম্বাসের স্ত্রী ফেলিপা অসুস্থ হয়ে পড়লো।সমস্ত চিকিৎসা সত্তেও অসুখ ক্রমসই গুরুতর হয়ে উঠলো।দূর প্রাচ্যের অভিযান বন্ধ রাখতে হল।কিছুদিন পর মারা গেলেন ফেলিপা।
কলম্বাসের জীবনেরে সব বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেল।এবার নতুন উদ্যমে ঝাপিয়ে পড়লেন তার অভিযানে।দেশের প্রায় প্রতিটি ধনী সম্ভ্রান্ত মানুষের দরজায় ঘুরে বেড়ান।জাহাজ চাই, নাবিব চাই,অর্থ চাই।কলম্বাসের দাবি ছিল যে দেশ আবিষ্কার হবে,তাকে সেই দেশের ভাইসরায় করতে হবে আর রাজ্যের একটা অংশ দিতে হবে।প্রাথমিকভাবে দু-একজন সম্মতি দিলেও কলম্বাসের দাবির কথা শুনে সকলেই তার প্রস্তাব প্রত্যাখান করল।
কলম্বাসের সাথে এই সময় একদিন পরিচয় হল ফাদার পিরোজ-এর।ফাদার পিরোজ ছিলেন রাজ পরিবারের অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং রাণী ইসাবেলা তাকে অত্যন্ত সম্মান করতেন।
কলম্বাসের ইচ্ছার কথা ফাদার নিজেই ইসাবেলাকে বললেন।অনুরোধ করলেন যদি তাকে কোনভাবে সাহায্য করা যায়।ফাদারের অনুরোধ প্রত্যাখান করতে পারলেন না রাণী।নতুন দেশ আবিষ্কারের সাথে সাথে বহু মানুষকে খ্রিষ্টানধর্মে দীক্ষিত করার পুণ্য অর্জন করা যাবে।
ফাদার পিরজ ছাড়াও আরো কয়েকজন সহ্দদয় ব্যক্তি কলম্বাসের সমর্থনে এগিয়ে এলেন।কলম্বাসের সব অনুরোধ স্বীকার করে নিলেন সম্রাট।১৭ই এপ্রিল,১৪৯২ তাদের মধ্যে চুক্তি হল।কলম্বাসকে নতুন দেশের শাসনভার দেওয়া হবে আর অর্জিত অর্থের এক দশমাংশ অর্থ দেওয়া হবে।
সম্রাটের কাছ থেকে অর্থ পেয়ে তিনখানা জাহাজ নির্মাণ করলেন কলম্বাস।সবচেয়ে বড় ১০০টনের সান্তামারিয়া,পিণ্টা ৫০টন,নিনা ৪০টন।জাহাজ তৈরির সময় কোন বিঘ্ন দেখা গেল না।সমস্যা সৃষ্টি হল নাবিক সংগ্রহের সময়।কলম্বাসের সাহায্যে এগিয়ে এল পিনজন ভাইরা।তাদের সাথে আরো কিছু বিশিষ্ট লোকের চেষ্টায় সর্বমোট ৮৭ জন নাবিক পাওয়া গেল।
অবশেষে ৩ আগস্ট,১৪৯২ কলম্বাস তার তিনটি জাহাজ নিয়ে পারি দিল অজানা সমুদ্রে।সেদিন যারা বন্দরে ছিলেন তাদের অধিকাংশই ভেবেছিল কেউই আর সেই অজানা দেশ থেকে ফিরে আসবে না।
ভেসে চললেন কলম্বাস।চারদিকে শুধু পানি আর পানি।দিনের পর দিন অতিক্রম হয়।কোথাও স্থলেন দেখা নেই,অধৈর্য হয়ে নাবিকরা।সকলকে সান্তনা দেন ,উৎসাহ দেন কলম্বাস কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ধৈর্য রাখতে পারেন না নাবিকরা।সকলে একসাথে বিদ্রহ করে,জাহাজ ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হকে।
কলম্বাসের চোখে পড়ে ভাঙা গাছের ডাল।সবুজ পাতা।অনুমান করতে অসুবিধা হয় না,তারা স্থলের কাছাকাছি এসে পৌছেছে।নাবিকদের কাছে শুধু একটি দিনের প্রার্থনা করলেন।দিনটি ছিল ১২ই অক্টবর।একজন নাবিব নাম,রোডারিগো প্রথম দেখলেন স্থলের চিহ্ন।আনন্দে উল্লাসে মেতে উঠলেন সকলে।
পরদিন কলম্বাস নামলেন বাহমা দ্বীপপুঞ্জের এক অজানা দ্বীপে।পরবর্তীকালে তিনি সেই দ্বীপের নাম রাখলেন সান সালভাদর।(বর্তমানের নাম ওয়েস্টলেং আইল্যান্ড)।এই দিনটি আজও উত্তর দক্ষিণ আমেরিকায় কলম্বাস দিবস হিসাবে পালিত হয়।
কলম্বস ভেবেছিলেন সমুদ্র পথে তিনি এশিয়া এসে পৌছেছেন।যেখানে অফুরন্ত সোনাদানা ছড়ানো রয়েছে।কিন্তু কোথায় আছে সেই সম্পদ…?দিনের পর দিন তন্ন তন্ন করে খোজার পরেও কোথাও ধনসম্পদের চিহ্ন পাওয়া গেল না।কলম্বাস গেলেন কিউবা এবং হিস্পানিওয়ালাতে দ্বীপে।স্থির করলেন এখানে সাময়িক আস্তানা স্থাপন করে ফিরে যাবেন স্পেনে।এরপরে বিরাট সংখ্যক লোক এনে খোজ করবেন ধনসম্পদের। হিস্পানিওয়ালাতে সাময়িক আস্তানা গড়ে তুললেন।সেখানে ৪২জন নাবিকের থাকার ব্যবস্থা করে রওনা হলেন স্বদেশের পথে।নতুন দ্বীপে পৌছাবার প্রমানস্বরুপ কিছু স্থানিয় আদিবাসিদের সাথে নিয়ে গেলেন।
শূন্য হাতে ফিরে এলেও দেশে অভূর্তপূর্ব সম্মান পেলেন তিনি।তার সম্মানে রাজা-রাণী বিরাট ভোজের আয়জোন করলেন।স্বংয়ন পোপ কলম্বাসক আর্শীবাদ জানিয়ে ঘোষণা করলেন,নতুন আবিস্কৃত সমস্ত দেশ স্পেনের অর্ন্তভুক্ত হবে।
সম্রাট ফার্দিনান্দ নতুন অভিযানের আয়েজন করলেনে।বিরাট নৌবহর,অসংখ্য লোক নিয়ে ১৮৯৩ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর কলম্বাস আটলান্টিক পার হয়ে দ্বিতীয় সমুদ্র অভিযান করলেন।
দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রা করে কলম্বাস এসে পৌছালেন হিম্পানিওয়ালাতে।সেখানে গিয়ে দেখলেন তার সঙ্গী-সাথীরা কেউ জীবিত নেই।কিছু মানুষ অসাস্থকর পরিস্থিতির জন্য মারা গেছে।অবশিষ্ট সকলে স্থানীয় আদিবাসীর হাতে মারা পড়েছে।
এই দ্বিতীয় অভিযানের সময়ও কলম্বাস চারদিকে ব্যাপক অনুসন্ধান করেও কোন ধনসম্পদের চিহ্ন মাত্র খুজে পেলেন না।শুধু মাত্র কিছু দ্বীপ আবিষ্কার করতে পারলেন।কোন ধন সম্পদ না পেয়ে স্থানীয় অধিবাসীদের বন্দী করে স্পেনে পাঠালেন।তখনো ইউরোপের বুকে দাস ব্যবসায়ের ব্যাপক প্রচালন ঘটেনি।কলম্বাসের এই কাজকে অনেকে আন্তরিকভাবে সামর্থন করতে পারলেন না।তাছাড়া আদিবাসীদেরে বিরাট অংশ নতুন পরিবেশে গিয়ে মারা পড়ল।ইসাবেলা কলম্বাসের এই আচরন অন্তর থেকে সামর্থন করতে পারলেন না।
এই সংবাদ কলম্বাসের কাছে পৌছাতে বিলম্বত হল না।তিনি মুহূর্ত মাত্র বিলম্বিত করলেন না।আড়াই বছর পর ১৪৯৬সালের ১১ই জুন ফিরে এলেন স্পেনে।কিন্তু প্রথম বারের মত সম্বর্ধনা পেলেন না।কিন্তু অজেয় মনবল কলম্বাসের।
নতুন অভিযানের জন্য আবেদন জানালেন কলম্বাস।প্রথমে দ্বিধাগ্রস্থ থাকলেও শেষ পর্যন্ত সম্মতি দিলেন সম্রাট।
১৪৯৮,৩০শে মে তৃতীয়বারের জন্য অভিযান শুরু করলেন কলম্বাস।এই বার তার সঙ্গী হল তার পুত্র ও তার ভাই।কলম্বাসের জীবনের দিন অস্তমিত হয়ে এসেছিল।হিস্পানিওয়ালার স্থানীয় মানুষেরা ইউরোপীয়নদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ঘোষনা করলো।মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত কলম্বাস অত্যাচারী শাসকের মত কঠোর হাতে বিদ্রহ দমন করলেন।শত শত মানুষকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হল।
কলম্বাসের সহযোগীরাও তার কাজে ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছিল।সম্রাটের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল,তিনি স্বধীন রাজ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।তিনি ফ্রান্সিসক্যে দ্য বোবদিলা নামে একজন রাজকর্মচারীকে সৈন্য সামান্ত দিয়ে পাঠালেন কলম্বাসের বিরুদ্ধে তদন্ত করার জন্য।কয়েকেদিন ধরে অনুসন্ধান করে রাজ্য স্থাপনের কোন অভিযোগ না পেলেও কলম্বাসের বিরুদ্ধে নির্বুদ্ধিতার অভিযোগ আনা হয়।কারণ কলম্বাস কোন সম্পদশালী দেশ আবিষ্কার করার বদলে সম্পদহীন দেশ আবিষ্কার করেছে।যার জন্য সম্রাটের বিরাট পরিমাণ অর্থ অপচয় হয়েছে।
এই অভিযোগে প্রথম বন্দী করা হল কলম্বাসের পুত্র ও ভাইকে।তারপর কলম্বাসকে।কলম্বাসকে শৃঙ্খলিতে করে আন হয় স্পেনে।তাকে রাখা হল নির্জন কারাগারে।সেখান থেকেই রাণী ইসাবেলাকে চিঠি লিখলেন কলম্বাস।
রাণী ইসাবেলো ছিলেন দয়ালু প্রকৃতির।তাছাড়া কলম্বাসের প্রতি বরাবরাই তার ছিল সহানুভুতিবোধ।তার চিঠি পড়ে তিনি মার্জনার আদেশে দিলেন।
পঞ্চাশ বছরে পা দিলেন তিনি।শরীরে তেমন জোর নেই কিন্তু মনের অদম্য সাহসে ভর দিয়ে চতুর্থ বারেরে জন্য সমুদ্রে যাত্রার আবেদন করলেন।সম্রাট সম্মতি দিলেন,শুধু হিস্পানিওয়ালাতে প্রবেশ নিষেধাঙ্গ করলেন।
১৫০২সাল ১৯শে মে কলম্বাস শুরু করলেন চতুর্থ সমুদ্র যাত্রা।তার ইচ্ছা ছিল আরো পশ্চিমে যাবেন।পথে তুমুল ঝড় উঠল।নিরুপায় কলম্বাস আশ্রয় নিল এক অজানা দ্বীপে।
কলম্বাস পৌছেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ এর দ্বীপে।সেখান থেকে ফিরে যান জামাইকা দ্বীপে।ক্রমশই তার দেহ ভেঙ পড়ছিল।অজানা রোগে তার অনেক সঙ্গীরাও মারা গিয়েছে।দু বছর পর নিরুৎসাহিত মনে স্পেনে ফিরে এলেন।
এরপর আর মাত্র দু বছর বেঁচে ছিলেন।যদিও অর্থ ছিল কিন্তু মনে শান্তি ছিল না।রাজ অনুগ্রহ থেকে সম্পুর্ণ বঞ্চিত হয়েছিলেন।তার আবিষ্কারের গুরুত্ব উপলব্ধি করবার ক্ষমতা দেশবাশীর ছিল না।
১৫০৬ সালে ভ্যাসাডোলিড শহরে এক সাধারন কুটিরে সকলের অগচরে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করলেন কলম্বাস।সেখান থেকে তার মৃতদেহ নিয়ে গিয়ে ডেমিঙ্গোতে সমাধি দেওয়া হয়।


আলবার্ট আইনস্টাইন
[১৮৭৯-১৯৫৫]

জার্মানীর একটি ছোট শহরে উলমে এক সম্পন্ন ইহুদী পরিবারে আইনস্টাইনের জন্ম (১৮৭৯ সালের ১৪ই মার্চ)। পিতা ছিলেন ইনঞ্জিনিয়ার। মাঝে মাঝেই ছেলেকে নানা খেলনা এনে দিতেন। শিশু আইনস্টাইনের বিচিত্র চরিত্রকে সেই দিন উপলব্ধি করা সম্ভব হয়নি তাঁর অভিভাবক, তাঁর শিক্ষকদের। স্কুলের শিক্ষদের কাছ থেকে মাঝে মাঝেই অভিযোগ আসত। পড়াশুনায় পিছিয়ে পড়া ছেলে, অমনোযোগী আনমনা। ক্লাসের কেই তাঁর সঙ্গী ছিল না। সকলের শেষে পেছনের বেঞ্চে গিয়ে বসতেন।
শুধু তাঁর একমাত্র সঙ্গী তাঁর মা। তাঁর কাছে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের নানান সুর শেখেন। আর বেহালায় সেই সুর তুলে নেন। এই বেহালা ছিল আইনস্টাইনের আজীব কালের সাথী। বাবাকে বড় একটা কাছে পেতেন না আইনস্টাইন। নিজের কারখানা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন তিনি। আনন্দেই কাটছিল তাঁর জীবন।
সেই আনন্দে ভরা দিনগুলোর মাঝে হঠাৎ কালো ঘনিয়ে এল। সেই শৈশবেই আইনস্টাইন প্রথম অনুভব করলেন জীবনের তিক্ত স্বাদ। তাঁরা ছিলেন ইহুদী। কিন্তু স্কুলে ক্যাথলিক ধর্মের নিয়মকানুন মেনে চলতে হত।
স্কুলের সমস্ত পরিবেশটাই বিস্বাদ হয়ে যায় তাঁর কাছে। দর্শনের বই তাঁকে সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ করত। পনেরো বছর বয়সের মধ্যে তিনি কাণ্ট, স্পিনোজো, ইউক্লিড, নিউটনের রচনা পড়ে শেষ করে ফেললেন। বিজ্ঞান, দর্শনের সাথে পড়তেন, গ্যেটে, শিলায়, শেকসপীয়র। অবসর সময়ে বেহালায় ছড়ে বিঠোফেন, মোৎসোর্টের সুর তুলতেন। এরাই ছিল তাঁর সঙ্গী, বন্ধু তাঁর জগৎ।
এই সময় বাবার ব্যবসায়ে মন্দা দেখা দিল। তিনি স্থির করলেন মিউনিখ ছেড়ে মিলানে চলে যাবেন। তাতে যদি ভাগ্যের পরিবর্তন হয়। সকলে মিউনিখ ত্যাগ করল, শুধু সেখানে একা রয়ে গেলেন আইনস্টাইন।
সুইজার‍্ল্যানণ্ডের একটি পলিটেকনিক স্কুলে ভর্তি হলেন। প্রথমবার তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেন। দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় পরীক্ষায় পাশ করলেন।
বাড়ির আর্থিক অবস্থা ক্রমশই খারাপ হয়ে আসছে। আইনস্টাইন অনুভব করলেন সংসারের দায়-দায়িত্ব তাঁকে গ্রহণ করতেই হবে। শিক্ষকতার বৃত্তি গ্রহণ করবার জন্য তিনি পদার্থবিদ্যা ও গণিত নিয়ে পড়াশুনা আরম্ভ করলেন। জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়ে শিক্ষকতার জন্য বিভিন্ন স্কুলে দরখাস্ত করতে আরম্ভ করলেন। অনেকের চেয়েই শিক্ষাগত যোগ্যতা তাঁর বেশি ছিল কিন্তু কোথাও চাকরি পেলেন না। কারণ তাঁর অপরাধ তিনি ইহুদী।
নিরুপায় আইনস্টাইন খরচ চালাবার প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্র পড়াতে আরম্ভ করলেন। এই সময় আইনস্টাইন তাঁর স্কুলের সহপাঠিনী মিলেভা মারেককে বিয়ে করলেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২২। মিলেভা শুধু আইনস্টাইনের স্ত্রী ছিলেন না, প্রকৃত অর্থেই তাঁর জীবনসঙ্গী ছিলেন।
আইনস্টাইন বুঝতে পারলেন, শিক্ষকতার কাজ পাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। একটি অফিসে ক্লার্কের চাকরি নিলেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিজের খাতার পাতায় সমাধান করতেন অঙ্কের জটিল তত্ত্ব। স্বপ্ন দেখতেন প্রকৃতির দুজ্ঞের্য় রহস্য ভেদ করবার। তাঁর এই গোপন সাধনার কথা শুধু মিলেভাকে বলেছিলেন, “আমি এই বিশ্বপ্রকৃতির স্থান ও সময় নিয়ে গবেষণা করছি”।
আইনস্টাইনেই এই গবেষণায় ছিল না কোন ল্যাবরোটরি, ছিল না নোক যন্ত্রপাতি। তাঁর একমাত্র অবলম্বন ছিল খাতা-কলম আর তাঁর অসাধারণ চিন্তাশক্তি।
অবশেষে শেষ হল তাঁর গবেষণা। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৬ বছর। একদিন ত্রিশ পাতার একটি প্রবন্ধ নিয়ে হাজির হলেন বার্লিনের বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক পত্রিকা “Annalen der physic” এর অফিসে। এই পত্রিকায় ‌১৯০১ থেকে পর্যন্ত আইনস্টাইন পাঁচটি রচনা প্রকাশ করলেন। এই সব রচনায় প্রচলিত বিষয়কে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এতে আইনস্টাইনের নাম বিজ্ঞানীমহলে ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কোন সুরাহা হল না। নিতান্ত বাধ্য হয়ে বাড়িতে ছাত্র পড়াবার কাজ নিলেন।
একদিকে অফিসের কাজ, মিলেভার স্নেহভরা ভালবাসা, অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা-অবশেষে ১৯০৫ সালে প্রকাশিত হল তাঁর চারটি রচনা-প্রথমটি আলোর গঠন ও শক্তি সম্পর্কে। দ্বিতীয়টি এটমের আকৃতি প্রকৃতি। তৃতীয়টি ব্রাউনিয়াম মুভমেন্টের ক্রমবিকাশের তত্ত্ব। চতুর্থটি তাঁর বিখ্যাত আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। বিজ্ঞানের জগতে এক নতুন দিগন্ত উদ্ভাসিত করল। এই আপেক্ষিকতা বলতে বোঝায় কোন বস্তুর সঙ্গে সম্বন্ধ বা অন্য কিছুর তুলনা। আইনস্টাইন বললেন, আমরা যখন কোন সময় বা স্থান পরিমাপ করি তখন আমোদের অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনা করতে হবে। তিনি বলেছেন আলোক বিশ্বজগৎ, কাল এবং মাত্রা আপেক্ষিক।
আমাদের মহাবিশ্বে একটি মাত্র গতি আছে যা আপেক্ষিক নয়, অন্য কোন গতির সঙ্গেও এর তুলনা হয় না-এই গতি হচ্ছে আলোকের গতি। এই গতি কখনই পরিবর্তন হয় না।
এই সময় জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনস্টাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হল। এখানে তাঁকে অনায়ারি ডক্টরেট উপাধি দেওয়া হল। এর পর তাঁর ডাক এল জার্মানীর সলসবার্গ কনফারেন্স থেকে। একানে জগৎবিখ্যাত বিজ্ঞানীদের সামনে তাঁর প্রবন্ধ পড়লেন আইনস্টাইন। তিনি বললেন, তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার অগ্রগতির পরবর্তী পর্যায়ে আমরা এমন কোন এক তত্ত্ব পাব যা আলোর কণাতত্ত্ব এবং তরঙ্গ তত্ত্বকে সময়ের বাঁধনে বাঁধতে পারবে।
আইনস্টানের এই উক্তির জবাবে বিজ্ঞানী প্লাঙ্ক বললেন, আইনস্টাইন যা চিন্তা করছেন সেই পর্যায়ে চিন্তা করবার সময় এখনো আসেনি। এর উত্তরে আইনস্টাইন তাঁর বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের E=mcউৎপত্তিটি আলোচনা করে বোঝালেন তিনি যা প্রমাণ করতে চাইছেন তা কতখানি সত্য।
১৯০৮ সালে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার পদ সৃষ্টি করা হল। রাজনৈতিক মহলের চাপে এই পদে মনোনীত করা হল আইনস্টাইনের সহপাঠী ফ্রেডরিখ এডলারকে। ফ্রেডরিখ নতুন পদে যোগ দিয়েই জানতে পারলেন এই পদের জন্য আইনস্টাইনের পরিবর্তে তাকে নিযুক্ত করা হয়েছে। তিনি কর্তৃপক্ষকে জানালেন এই পদের জন্যে আইনস্টাইন এর চেয়ে যোগ্য ব্যাক্তি আর কেউ নেই । তাঁর তুলনায় আমার জ্ঞান নেহাতই নগণ্য।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও উপলব্ধি করতে পারলেন ফ্রেডরিখের কথার গুরুত্ব। অবশেষে ১৯০৯ সালে আইনস্টাইন তাঁর পেটেন্ট অফিসের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে পুরোপুরি শিক্ষকতার পেশা গ্রহণ করলেন। জুরিখে এসে বাসা ভাড়া করলেন।
আইনস্টাইন আর কেরানী নন, প্রফেসর। কিন্তু মাইনে আগে পেতেন ৪৫০০ ফ্রাঙ্ক, এখনো তাই। তবে লেকচার ফি বাবদ সামান্য কিছু বেশি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সুযোগ বহু মানুষের সাথে, গুণী বিজ্ঞানীদের সাথে পরিচয় হয়। এমন সময় ডাক এল জার্মানীর প্রাগ থেকে। জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক হিসেবে তাঁকে নিয়োগপত্র দেওয়া হল। মাইনে আগের চেয়ে বেশি। তাছাড়া প্রাগে গবেষণার জন্যে পাবেন বিশাল লাইব্রেরী। ১৯১১ সালে সপরিবারে প্রাগে এলেন আইনস্টাইন। কয়েক মাস আগে তাঁর দ্বিতীয় পুত্রের জন্ম হয়েছে।
অবশেষে দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষিত জুরিখের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক এল আইনস্টাইনের। ১৯২২ সালে প্রাগ ত্যাগ করে এলেন জুরিখে। এখানে তখন ছুটি কাটাতে এসেছিলেন মাদাম কুরী, সঙ্গে দুই কন্যা। দুই বিজ্ঞানীর মধ্যে গড়ে উঠল মধুর বন্ধুত্ব। পাহাড়ি পথ ধরে যেতে যেতে মাদাম কুরী ব্যাখ্যা করেন তেজস্ক্রিয়তা আর আইনস্টাইন বলেন তাঁর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। একদিন নিজের তত্ত্বের কথা বলতে বলতে এত তন্ময় হয়ে পড়েছিলেন, পথের ধারে গর্তের মধ্যে গড়িয়ে পড়লেন আইনস্টাইন। তাই দেখে মেরী কুরীর দুই মেয়ে হাসিতে ফেটে পড়ল। গর্ত থেকে উঠে তাদের সঙ্গে আইনস্টাইনও হাসিতে যোগ দিলেন।
সেই সময় জার্মানীতে কাইজারের পৃষ্ঠপোষকতায় বার্লিন শহরে গড়ে উঠেছে কাইজার ভিলহেম ইসস্টিটিউট। বিজ্ঞানের এতবড় গবেষণার পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এখানে যোগ দিয়েছেন প্লাঙ্ক, নার্নস্ট, হারের্র আরো সব বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা। কিন্তু আইনস্টাইন না থাকলে যে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে সব কিছু। তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হল।
বার্লিনে এলেন আইনস্টাইন। যখন আইনস্টাইন বার্লিন ছেড়েছিলেন তখন তিনি পনেরো বছরের কিশোর। দীর্ঘ কুড়ি বছর পর ফিরে এলেন নিজের শহরে। চেনা-জানা পরিচিত মানুষদের সাথে দেখা হল। সবচেয়ে ভাল লাগল দূর সম্পর্কিত বোন কাছে ফিরে এসেছে। এলসার সান্নিধ্য বরাবরই মুগ্ধ করত আইনস্টাইনকে। অল্পদিনেই অনেকের সাথেই বন্ধুত্ব গড়ে উঠল।
ছেলেবেলা থেকেই যেখানে সেখানে অঙ্ক করার অভ্যাস ছিল আইনস্টাইনের। কখনো ঘরের মেঝেতে, কখনো টেবিলের উপর। টেবিল ভর্তি হয়ে গেলে মাটিতে বসে চেয়ারের উপরেই অঙ্ক কষে চলেছেন।
গবেষণায় যতই মনোযোগী হয়ে উঠেছিলেন আইনস্টাইন, সংসারের প্রতি ততই উদাসীন হয়ে পড়ছিলেন। স্ত্রী মিলেভার সাথে সম্পর্ক ভাল যাচ্ছিল না। ক্রমশই সন্দেহবাতিকগ্রস্থ হয়ে পড়ছিলেন মিলেভা। দুই ছেলেকে নিয়ে সুইজারল্যাণ্ডে চলে গেলেন। কয়েক মাস কেটে গেল আর ফিরলেন না মিলেভা।
এদিকে প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হল। বিজ্ঞানীদের অধিকাংশই জড়িয়ে পড়লেন যুদ্ধে। আইনস্টাইন এই যুদ্ধের বীভৎসতা দেখে ব্যথিত হলেন। এরই সাথে সংসারের একাকিত্ব, স্ত্রী পুত্রকে হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন আইনস্টাইন।
এই সময় অসুস্থ আইনস্টাইনের পাশে এসে দাঁড়ালেন এলসা। এলসার অক্লান্ত সেবা-যত্নে ক্রমশই সুস্থ হয়ে উঠলেন আইনস্টাইন।
তিনি স্থির করলেন মিলেভার সাথে আর সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব নয়। অবশেষে তাঁদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে গেল। আইনস্টাইন এলসাকে বিয়ে করলেন।
এদিকে যুদ্ধ শেষ হল। কাইজারের পতন ঘটল। প্রতিষ্ঠা হল নতুন জার্মান রিপাবলিকের।
আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব তখনো প্রমাণিত হয়নি। এগিয়ে এলেন ইংরেজ বিজ্ঞানীরা। সূর্যগ্রহণের একাধিক ছবি তোলা হল। সেই ছবি পরীক্ষা করে দেখা গেল আলো বাঁকে। বিজ্ঞানীরা উত্তেজনায় ফেটে পড়লেন। মানুষ তাঁর জ্ঞানের সীমানাকে অতিক্রম করতে চলেছে। অবশেষে ৬ই নভেম্বর ইংল্যাণ্ডের রয়াল সোসাইটিতে ঘোষণা করা হল সেই যুগান্তকারী আবিষ্কার, আলো বেঁকে যায়। এই বাঁকের নিয়ম নিউটনের তত্ত্বে নেই। আলোর বাঁকের মাপ আছে আইসস্টানের আপেক্ষিকতাবাদের সূত্রে।
পরিহাসপ্রিয় আইনস্টাইন তাঁর এই যুগান্তকারী আবিষ্কার নিয়ে কৌতুক করে বললেন, আমার আপেক্ষিক তত্ত্ব সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে। এইবার জার্মানী বলবে আমি জার্মান আর ফরাসীরা বলবে আমি বিশ্বনাগরিক। কিন্তু যদি আমার তত্ত্ব মিথ্যা হত তাহলে ফরাসীরা বলত আমি জার্মান আর জার্মানরা বলত আমি ইহুদী।
একদিন এক তরুণ সাংবাদিক বললেন, আপনি সংক্ষেপে বলুন আপেক্ষিক তত্ত্বটা কি?
আইনস্টাইন কৌতূক করে বললেন, যখন একজন লোক কোন সুন্দরীর সঙ্গে এক ঘণ্টা গল্প করে তখন তার মনে হয় সে যেন এক মিনিট বসে আছে। কিন্তু যখন তাকে কোন গরম উনানের ধারে এক মিনিট দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, তার মনে হয় সে যেন এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছে। এই হচ্ছে আপেক্ষিক তত্ত্ব।
আপেক্ষিক তত্ত্বে জটিলতার দুর্বোধ্যকতার কারণে মুখরোচক কিছু কাহিনী ছড়িয়ে পড়ল। একদিন এক সুন্দরী তরুণী তার প্রেমিকের সাথে চার্চের ফাদারের পরিচয় করিয়ে দিল। পরদিন যখন মেয়েটি ফাদারের কাছে গিয়েছে, ফাদার তাকে কাছে ডেকে বললেন, তোমার প্রেমিককে আমার সবদিক থেকেই ভাল লেগেছে শুধু একটি বিষয় ছাড়া। মেয়েটি কৌতূহলে জিজ্ঞাসা করল, কোন বিষয়? ফাদার বললেন, তার কোন রসবোধ নেই। আমি তাকে আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের কথা জিজ্ঞাসা করেছি আর সে আমাকে তাই বোঝাতে আরম্ভ করল। হাসিতে ফেটে পড়ল মেয়েটি।
আমেরিকার এক বিখ্যাত সরকার জর্জ তাঁর এক বন্ধুকে বললেন, একজন মানুষ কুড়ি বছর ধরে একটা বিষয় নিয়ে চিন্তা করলেন, আর ভাবলে অবাক হতে হয় সেই চিন্তটুকুকে প্রকাশ করলেন মাত্র তিন পাতায়। বন্ধুটি জবাব দিল, নিশ্চয়ই খুব ছোট অক্ষরে ছাপা হয়েছিল।
আইনস্টাইন আমেরিকায় গিয়েছেন, সাংবাদিকরা তাঁকে ঘিরে ধরল। একজন জিজ্ঞেস করল, আপনি কি এক কথায় আপেক্ষিক তত্ত্বের ব্যাখ্যা করতে পারেন? আইনস্টাইন জবাব দিলেন, না।
আজকাল মেয়েরা কেন আপেক্ষিক তত্ত্ব নিয়ে এত আলোচনা করছে? আইনস্টাইন হাসতে হাসতে বললেন, মেয়েরা সব সময়েই নতুন কিছু পছন্দ করে-এই বছরের নতুন জিনিস হল আপেক্ষিক তত্ত্ব।
অবশেষে এল সাধক বিজ্ঞানীর জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার নিয়ে। কিছুদিন ধরেই নোবেল কমিটি আইনস্টাইনকে নোবেল পুরষ্কার দেওয়ার কথা চিন্তা করছিল। কিন্তু সংশয় দেখা গেল স্বয়ং নোবেলের ঘোষণার মধ্যে। তিনি বলে গিয়েছিলেন পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরষ্কার পাবেন আবিষ্কারক আর সেই আবিষ্কা যেন মানুষের কল্যাণে লাগে। আইনস্টাইন-এর বেলায় বিতর্ক দেখা দিল তাঁর আপেক্ষিক তত্ত্ব যুগান্তকারী হলেও প্রত্যক্ষভাবে তা মানুষের কোন কাজে লাগবে না।
তখন স্থির তাঁর ফটো ইলেকট্রিক এফেক্ট বা আলোক তড়িৎ ফলকে সরাসরি আবিষ্কার হিসেবে বলা সম্ভব। এবং এর প্রত্যক্ষ ব্যবহারও হচ্ছে তাই ঘোষণা করা হল “Serfvice to the theory of Physics especially for the fLaw of the Photo Electric Effect”.
আইনস্টাইন তাঁর প্রথমা স্ত্রী মিলেভার সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের শর্ত অনুসারে নোবেল পুরষ্কারের পুরো টাকাটা তাঁকে পাঠিয়ে দেন। আমেরিকায় বক্তৃতা দেবার জন্য বার বার ডাক আসছিল। অবশেষে ১৯৩০ সালে ডিসেম্বর মাসে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গেলেন, সেখানে অভূতপূর্ব সম্মান পেলিন। শুধু আমেরিকা নয়, যখন যে দেশেই যান সেখানেই পান সম্মান আর ভালবাসা।
এদিকে স্বদেশ জার্মানী ক্রমশই আইনস্টাইনের কাছে পরবাস হয়ে উঠেছিল। একদিকে তাঁর সাফল্য স্বীকৃতিকে কিছু বিজ্ঞানী, ঈর্ষার দৃষ্টিতে থাকে অন্য দিকে হিটলারের আর্বিভাবে দেশ জুড়ে এক জাতীয়তাবাদের নেশায় মত্ত হয়ে ওঠে একদল মানুষ। ইহুদীরা ক্রমশই ঘৃণিত দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে পরিগণিত হতে থাকে। আইনস্টাইন বুঝতে পারলেন জার্মানীতে থাকা তাঁর পক্ষে মোটেই নিরাড়দ নয়। কিন্তু কোথা যাবেন? আহ্বান আসে নানা দেশ থেকে। অবশেষে স্থির করলেন আমেরিকার প্রিন্সটনে যাবেন।
জার্মানী থেকে ইহুদী বিতাড়ণ শুরু হয়ে যায়। আইনস্টাইন বুঝতে পারলেন তাঁরও যাবার পালা। প্রথমে গেলেন ইংল্যাণ্ডে। সেখান থেকে ১৯৩৪ সালের ৭ই জুলাই রওনা হলেন আমেরিকায়। তখন তাঁর বয়স পঞ্চান্ন।
প্রিন্সটনের কর্তৃপক্ষ আইনস্টাইনের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। গুপ্তঘাতকের দল যে সাগর পেরিয়ে আমেরিকায় এসে পৌঁছবে না তাই বা কে বলতে পারে। তাই তাঁকে গোপন জায়গায় রাখা হল। সেই বাড়ির ঠিকানা কাউকে জানানো হল না বলে ফোনটা নামিয়ে রাখলেন ডিরেকটার। খানিক পরে আবার ফোন বেজে উঠল। আমি আইনস্টাইন বলছি, বাড়ির নম্বর আর রাস্তা দুটোই ভুলে গিয়েছি। যদি দয়া করে বলে দেন।
এ এক বিচিত্র ঘটনা, যে মানুষটি নিজের ঘরের ঠিকানা মনে রাখতে পারেন না, তিনি বিশ্বপ্রকৃতির রহস্যের ঠিকানা খুঁজে বের করেন।
প্রকৃতপক্ষে জীবনের উত্তরপর্বে এসে আইনস্টাইন হয়ে উঠেছিলেন গৃহ সন্ন্যাসী। বড়দের চেয়ে শিশুরাই তাঁর প্রিয়। তাদের মধ্যে গেলে সব কিছু ভুলে যান। শিশুদের কাছে কল্পনার খ্রিস্টমাস বুড়ো। পরনে কোট সেই, টাই নেই, জ্যাকেট সেই। ঢলঢলে প্যান্ট আর গলা-আটা সোয়েটার, মাথায় বড় বড় চুল, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, ঝ্যাটা গোঁফ। দাড়ি কামাতে অর্ধেক দিন ভুলে যান। যখন মনে পড়ে গায়ে মাখা সাবানটা গলে ঘষে দাড়ি কেটে নেন। কেউ জিজ্ঞেস করলে কি ব্যাপার গায়ে মাখা সাবান দিয়ে দাড়ি কাটা। আইনস্টাইন জবাব দিতেন, দু’রকম সাবান ব্যবহার করে কি লাভ। শুধু নির্যাতিত ইহুদীদের স্বপক্ষে নয়, তিনি ক্রমশই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন সমগ্র মানবজাতির ভবিষ্যতের কথা ভেবে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে যারা সংগ্রাম করছে, দলমত নির্বিশেষে তিনি তাদের সমর্থন করলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন একদিন মানুষ এই ধ্বংসের উন্মাদনা ভূলে এক হবেই। আর একত্বতার মধ্যেই মানুষ খুঁজে পাবে তার ধর্মকে।
আইনস্টাইনের কাছে এই ধর্মীয় চেতনা প্রচলিত কোন সীমার মধ্যে আবদ্ধ চিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন ধর্ম মানবতারই এক মূর্ত প্রকাশ। বিজ্ঞান শুধু “কি” তার উত্তর দিতে পারে “কেন” বা “কি হওয়া উচিত” সে উত্তর দেবার ক্ষমতা নেই। অপর দিকে ধর্ম শুধু মানুষের কাজ আর চিন্তার মূল্যায়ন করতে পারে মাত্র। সে হয়ত মানব জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌছঁবার পথ বলে দেয় বিজ্ঞান। …তাই ধর্ম ছাড়া বিজ্ঞান পঙ্গু আর বিজ্ঞান ছাড়া ধর্ম অন্ধ।
মানবতাবাদী আইনস্টাইন একদিকে শান্তির জন্যে সংগ্রাম করছিলেন অন্যদিকে প্রকৃতির রহস্য উদঘাটান একের পর এক তত্ত্ব আবিষ্কার করছিলেন। এই সময় তিনি প্রধানত অভিকর্ষ ও বিদ্যুৎ চৌম্বকক্ষেত্রের মিলন সাধনের প্রচেষ্টায় অতিবাহিত করেন। কোয়াণ্টাম বলবিদ্যার বিকাশের পথে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল কিন্তু এই তত্ত্বের সম্ভাব্যতাভিত্তিক চরিত্রে তাঁর সম্পূর্ণ আস্থা ছিল না।
১৯৩৬ সালে হঠাৎ স্ত্রী এলসা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সুদীর্ঘ ষোলো বছর ধরে এলসা ছিলেন আইনস্টাইনের যোগ্য সহধর্মিনী, তাঁর সুখ-দুঃখের সঙ্গী।
আইনস্টাইন সব বুঝতে পারেন কিন্তু অসহায়ের মত তিনি শুধু চেয়ে থাকেন। অবশেষে ১৯৩৬ সালে চিরদিনের মত প্রিয়তম আইনস্টাইন কে ছেড়ে চলে গেলেন এলসা। এই মানসিক আঘাতে সাময়িকভাবে ভেঙ্গে পড়লেন আইনস্টাইন।
এই সময় পারমাণবিক শক্তির সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। এই শক্তির ভয়াবহতা সকলেই উপলব্ধি করতে পারছিলেন। পরীক্ষায় জানা গেল পারমাণবিক শক্তি সৃষ্টির জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক ধাতু হল ইউরেনিয়াম। আর এই ইউরেনিয়াম তখন একমাত্র পাওয়া যায় কঙ্গো উপত্যাকায়। কঙ্গো বেলজিয়ামের অধিকারভুক্ত। বিজ্ঞানী মহল আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ল যদি জার্মানদের হাতে এই ইউরেনিয়াম পড়ে তাহলে তারা পরমাণু বোমা বানাতে মুহূর্ত মাত্র বিলম্ব করবে না। গোপনে সংবাদ পাওয়া যায় জার্মান বিজ্ঞানীরা নাকি জোর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।
আইনস্টাইন উপলব্ধি করলেন তাঁর সমীকরণ প্রমাণিত হতে চলেছে। সামান্য ভরের রুপান্তরের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে অপরিমেয় শক্তি। আইনস্টাইন লিখেছেন, “ আমার জীবনকালে এই শক্তি পাওয়া যাবে ভাবতে পারিনি”।
এদিকে জার্মান বাহিনী দুর্বাবর গতিতে এগিয়ে চলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রপক্ষের বিজ্ঞানীরা উপলব্ধি করলেন যুদ্ধ জয় করতে গেলে এ্যটম বোমা তৈরি করা দরকার। এবং তা জার্মানীর আগেই তৈরি করতে হবে। সকলে সমবেতভাবে আমেরিকরা প্রেসিডেন্ট রুজভেষ্টকে আবেদন জানাল।
যদিও এই আবেদনপত্র সই করেছিলেন আইনস্টাইন, আমেরিকায় পরমাণু বোমা তৈরির ব্যাপারে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনভাবেই তিনি জড়িত ছিলেন না।
শেষ দিকে তিনি চেয়েছিলেন এই গবেষণা বনধ হোক। তিনি বিজ্ঞানী মাক্স বোর্নকে বলেন, পরমাণু বোমা তৈরির জন্য আবেদনপত্রে আমার সই করটাই সবচেয়ে বড় ভুল।
জাপানে এ্যাটম বোমা ফেলবার পর তার বিধ্বংসী রুপ দেখে বিচলিত আইনস্টাইন লিখেছেন, “পারমাণবিক শক্তি মানব জীবনে খুব তাড়াতাড়ি আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেবে-হয়তো পরোক্ষভাবে তা ভালই করবে। ভয় পেয়ে মানবজাতি তাদের পারস্পরিক সম্বন্ধের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নিয়ম-শৃঙ্খলা চালু করবে। ভয় ছাড়া মানুষ বোধহয় কখনোই শান্তির পথে অগ্রসর হতে পারবে না।
১৯৫০ সালে প্রকাশিত হল তাঁর নতুন তত্ত্ব (A generalized theory of Gravitation) মহাকর্ষের সর্বজনীন তত্ত্ব। এত জটিল সেই তত্ত্ব, খুব কম সংখ্যক মানুষই তা উপলব্ধি করতে পারলেন।
যখন বিজ্ঞানীরা তাঁকে তাঁর এই নতুন তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে বললেন, তিনি সকৌতুকে বললেন, কুড়ি বছর পর এর আলোচনা করা যাবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে উঠেছে নতুন ইহুদী রাষ্ট্র ইসরায়েল। আইনস্টাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হল নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হবার জন্য।
আইনস্টাইন জানালেন,প্রকৃতির তত্ত্ব কিছু বুঝলেও মানুষ রাজনীতিরি কিছুই বুঝেন না।তাছাড়া রাষ্ট্রপতির পদ শুধুমাত্র শোভাবর্ধনের জন্য।শোভা হলেও তাঁর বিবেক যা মানতে পারেনা তাকে তিনি কখনোই সমর্থন করতে পারবেন না।
জীবন শেষ হয়ে আসছিল,এই সময় ইংরেজী মনীষী বার্ট্রানু রাসেলের অনুরোধে বিশ্বশান্তির জন্য খসড়া লিখতে আরম্ভ করলেন।কিন্তু শেষ করতে পারলেন না।
১৯৯৫ সালের ১৮ই এপ্রিল তাঁর জীবন শেষ হল।তাঁর ইচ্ছা অনুসারে মৃতদেহটা পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হল।শোনা যায় পরীক্ষার জন্য তাঁর ব্রেন কোন গবেষেনাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।সে সম্বন্ধে আর কোন কথা প্রকাশ করেনি।


ইসা (আঃ)
(খ্রীঃ পূর্ব ৬-৩০)

বিবি মরিয়ম নাছেরাহ নামক একটি শহরের অধিবাসিনী ছিলেন। নাছেরাহ শহরটি বাইতুল মুকাদ্দাসের অদূরেই অবস্থিত ছিল। বিবি মরিয়ম পিতা মাতার মানত পূর্ণ করার জন্য বাইতুল মুকাদ্দাসের খেদমতে নিযুক্ত ছিলেন বাল্যকাল থেকেই। অতিশয় সুশীলা এবং ধর্মানুরাগিনী ছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিল ইমরান এবং নবী জাকারিয়া (আঃ) এর শ্যালিকা বিবি হান্না তাঁর জননী ছিলেন। একদিন বিবি মরিয়ম নামাজ পড়ছিলেন, হঠাৎ ফেরেশতা জিব্রাঈল অবতীর্ণ হলেন। তিনি বললেন, তোমার প্রতি সালাম, তুমি আল্লাহর অনুগ্রহ প্রাপ্তা। আল্লাহ তোমার সাথে রয়েছেন ।
বিবি মরিয়ম এই অপ্রত্যাশিত পূর্ব সম্বোধনে ভীত চকিতা হলেন। ভাবতে লাগলেন-কে আসল, কিসের সালাম। হযরত জিব্রাঈল বললেন-আমি অল্লাহর ফেরেশতা জিব্রাঈল। তুমি ভীত হইও না; তুমি পবিত্র সন্তান লাভ করবে। এই সুসংবাদ তোমাকে দিতে এসেছি।
বালিকা ভীত হলেন এবং বললেন-তা কেমন করে হবে? আমি যে কুমারী। আমি স্বামীর সঙ্গ লাভ করিনি।
ফেরেশতা বললেন, “আল্লাহর কুদরতেই এটি হবে। তাঁর কাছে এটি কঠিন কাজ নয়।”
এই বলে ফেরেশতা অন্তর্নিহিত হলেন। ছয়মাস পূর্বে হযরত জাকারিয়া (আঃ)-এর স্ত্রী গর্ভবতী হয়েছেন-এখন আবার কুমারী মরিয়ম আল্লাহর কুদরতে গর্ভবতী হলেন।
বিবি মরিয়ম যদিও আল্লাহর কুদরতে সন্তান সম্ভবা হলেন, কিন্তু দেশের লোকেরা তা মেনে নিবে কেন? কুমারী নারীর এভাবে গর্ভবতী হওয়ার ফলে সবাই তাকে বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে বের করে দিলেন-এমন কি তাকে স্বগ্রাম ছেড়ে যেতে হলো্। সঙ্গী সহায়হীন অবস্থায় গর্ভবতী মরিয়ম একটি নির্জন প্রান্তরে সন্তান প্রসব করলেন।
বিপদাপন্ন মরিয়ম কোন আশ্রয় খুঁজে না পেয়ে একটি শহরের দ্বারপ্রান্তে আস্তাবলের একটি পতিত প্রাঙ্গণের খেজুর গাছের নীচে আশ্রয় নিলেন। হায়-যিনি পৃথিবীর মহা সম্মানিত নবী, তিনি সেই নগন্য স্থানে ভূমিষ্ঠ হলেন। যে মহানবীর ধর্মানুসরণকারিরা আজ পৃথিবীময় বিস্তৃত, শক্তি এবং সম্মানে যারা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করে রয়েছে; তাদের নবী ভূমিষ্ঠ হলেন একটি আস্তাবলের অব্যবহার্য আঙ্গিনায়। দরিদ্রতম পিতা-মাতার সন্তানও এই সময় একটু শয্যালাভ করে থাকে, একটু শান্তির উপকরণ পায়, কিন্তু মরিয়মের সন্তান শোয়াবার জন্য আস্তাবলের ঘরটুকু ছাড়া আর কিছুই ভাগ্যে হলো না। আটদিন বয়সে সন্তানের ত্বক ছেদনা করা হলো। তাঁর নামকরণ হলো ইছা। ইনি মছিহ নামে প্রসিদ্ধ হয়েছেন। হযরত মুছা (আঃ)- এর শরীয়ত অনুসারে বাদশাহ কিংবা পয়গাম্বর তাঁর পদে বহাল হবার অনুষ্ঠানে, তৈল লেপন করার নিয়ম ছিল। এছাড়া তৌরিত কেতাবে হযরত ইছা (আঃ)- এর নাম মছিহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করলে একজোড়া ঘুঘু জাতীয় পাখি উৎসর্গ করার নিয়ম হযরত মুছা (আঃ)-এর শরীয়তের বিধান ছিল। মরিয়ম সূচী-স্নাতা হওয়ার পর সন্তান সাথে নিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসে গেলেন এবং সেখানে গিয়ে পাখীর মানত পালন করলেন।
এই সময় একদল অগ্নিপূজক হযরত ইছা (আঃ)-কে খুঁজে ফিরছিল। তারা জ্যোতিষী ছিল। নক্ষত্র দেখে তারা ‘হযরত ইছা এর জন্ম হয়েছে’ এটি জানতে পেরেছিল। হিরুইস বাদশাহ এটি শুনে ভয় পেলেন এবং সেই অনুসন্ধানকারী দলের কাছে গোপনে বললেন যে, তারা যেন সেই বালকের সন্ধান করে কোথায় আছে তা বের করে। অগ্নিপূজকরা খুঁজতে খুঁজতে বিবি মরিয়মের কাছে পৌছালো ও সেই ক্ষুদ্র শিশুকে সেজদা করল এবং সেখানে মানত ইত্যাদি সম্পন্ন করল। রাতে তারা স্বপ্নে দেখল, তাদেরকে হিরুইসের কাছে ফিরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা হিরুইস তার জীবনের শত্রু। মরিয়ম এরুপ স্বপ্ন দেললেন যে, সম্রাট এই সন্তানের শত্রু, সে তাকে হত্যা করতে চায়। সে যেন শিশুকে নিয়ে মিশরে চলে যায়। জ্যোতিষীরা সম্রাটের কাছে আর ফিরে গেল না। এতে বাদশাহ ভয়ানক রাগ হলো। সে হুকুম করল যে, বায়তুল্লাহর এবং এর আশেপাশের সকল বস্তির সন্তানদেরকে যেন হত্যা করে ফেলা হয়।
ইতিপূর্বে মরিয়ম তাঁর সন্তান নিয়ে মিশরে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন। হিরুইস যতদিন জীবিত ছিল, ততদিন সন্তান নিয়ে তিনি মিশরেই অবস্থান করলেন।
হিরুইসের মৃত্যুর সংবাদ শুনার পর তিনি নিজ দেশ নাছেরায় চলে আসলেন।
সন্তান দিন দিন বাড়তে লাগল। বয়স বাড়বার সাথে সাথে ইছার মধ্যে প্রখর জ্ঞান এবং তীক্ষ্ম মেধা শক্তির পরিচয় ফুটে উঠল। আল্লাহর বিশেষ একটি অনুগৃহ যে, তাঁর উপর রয়েছে, দিন দিন তা প্রকাশ পেতে শুরু করল। ইছার মাতা ইছা সহ প্রতি বৎসর ঈদের উৎসবে ইরুসালেমে যোগদান করতেন। ইছার ১২ বৎসর বয়সে ইরুসালেমে বড় বড় জ্ঞানী এবং পন্ডিতবর্গের সাথে ধর্ম বিষয়ে হযরত ইছা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পূর্ণতা লাভ করতে লাগলেন। ত্রিশ বৎসব বয়সে তিনি আল্লাহর কাছ থেকে ‘অহী’ লাভ করেন এবং নবীরুপে ধর্মপ্রচার করতে শুরু করলেন।
হযরত ইয়াহইয়া বিবি মরিয়মের খালাত ভাই হতেন। তিনি ইয়ারদন নদীর তীরে লোকদেরকে ধর্মোপদেশ দান করতেন। হযরত ইছা (আঃ) সেখানে গিহয়ে ওয়াজ করতে শুরু করেন। -অহী আসা শুরু করার পর থেকে ইনজীল কেতাব অবতীর্ণ হতে থাকে। তিনি তাঁর নবুয়্যতের প্রমাণ স্বরুপ বহু অলৌকিক কার্যাবলী দেখাতে শুরু করেন। মাটি দিয়ে পাখী তৈরি করে উড়িয়ে দেয়া, অন্ধকে দৃষ্টিদান, বোবাকে বাক্শক্তি দান, কুষ্ঠকে আরোগ্য করা, পানির উপরে হাটা ইত্যাদি তাঁর মো’জেজা ছিল।
তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির বলে, বহু রোগী আরোগ্য লাভ করে। বহু লোক ধর্মজ্ঞান লাভ করে। সর্বপ্রথম যারা হযরত ইছা (আঃ) –এর উপর যারা ঈমান এনেছিলেন, সাথে থেকে সাহায্য করেছিলেন তাদেরকে ‘হাওয়ারী’ বলা হতো। তাঁরা সর্বদা হযরত ইছা (আঃ) এর সাথে থাকতেন। হযরত ইছা (আঃ) যখন নবী হন, সেকালে ইয়াহুদী ধর্মগুরুরা অতিশয় শিথিল হয়ে পড়েছিলেন। তাদের মধ্যে প্রকৃত ধর্মানুভূতির পরিবর্তে ভন্ডামী প্রবেশ করেছিল। তাদের মধ্যে কেবল ধর্মের বাহ্যিক আবরণ বাকী ছিল। হযরত ইছা (আঃ) এর ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি তাঁর ওয়াজ বক্তৃতায় ইয়াহুদী ধর্মগুরুদের কঠোর সমালোচনা করতেন। এতে সেই সকল বাহ্যাবরণ বিশিষ্ট ইয়াহুদী ধর্মপ্রচারকরা হযরত ইছা (আঃ)-এর ঘোর শত্রুতে পরিণত হন। কিন্তু হযরত ইছা (আঃ)—এর বাণী ছিল আল্লাহরই বাণী। তা এমনই হৃদয়গ্রাহী হতো যে, যে শুনত তার হৃদয়ই তাতে আকৃষ্ট হতো। বিদ্বেষপরায়ণ ইয়াহুদী পুরোহিতরা কোন কথায় হযরত ইছা (আঃ)-কে ধরতে পারতেন না। তারা হযরত ইছা (আঃ) –কে নানা ছুতা-নাতায় দোষী সাব্যস্ত করবার চেষ্টায় লিপ্ত হলেন।
হযরত ইছা (আঃ) আল্লাহর অত্যাধিক প্রেমে অভিভূক্ত হয়ে আল্লাহকে পিতা বলেছিলেন। এরুপ আরো দুই একটি দৃষ্টান্তমূলক বাক্য নিয়ে হিংসাপরায়ণ ইয়াহুদী আলেমগণ নানা কথা সৃষ্টি করলেন। এভাবে তারা হযরত ইছা (আঃ)-কে ধর্মদ্রোহী কাফের বলে ফতোয়া দিলেন। তাদের শরীয়তে মৃত্যুই সেই সকল অপরাধ এর একমাত্র সাজা। দেশে তখন রুমীয়দের রাজত্ব ছিল। তখনকার দিনে রাজা ছাড়া আর কারো মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অধিকার ছিল না। সুতরাং তারা সম্রাটের কানে হযরত ইছা (আঃ)-এর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করতে শুরু করলেন।
হযরত ইছা (আঃ) তাঁর বক্তৃতার অধিকাংশ সময় আসমানী বাদশাহের কথা উল্লেখ করতেন। এতে শত্রুদের একটি সুযোগ জুটে গেল। তারা আসমানী বাদশাহীর ব্যাখ্যা একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হযরত ইছা (আঃ)-এর প্রতি রাজদ্রোহীর অভিযোগ সৃষ্টি করল। গোপনভাবে তাকে ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে লাগল।
অদৃষ্টের এমনি বিড়ম্বনা, যে হাওয়োরী দল ইছা (আঃ)-এর সঙ্গী এবং বিশ্বস্ত বন্ধুরুপে বিরাজ করতেন, তারাই এখন গুপ্তচর হলেন। সেই হাোয়াদীদের মধ্যে একজনের নাম ছিল ইয়াহুদ। শত্রুদের কাছ থেকে তিন টকার ঘুষ গ্রহণ করে হযরত ইছা (আঃ) –কে রুমীয় সৈন্যদের হাতে ধরিয়ে দিল।
হাওয়ারীয়দের মধ্যে পিতর ছিল একজন ঘনিষ্ঠ এবং প্রধান সঙ্গী, রাজদ্রোহের অপরাধ থেকে বাঁচবার জন্য তিনি সম্রাটের দরবারে নিজ পরিচয় গোপন এবং হযরত ইছা (আঃ)-এর সাথে কোনো সম্পর্ক নেই বলে প্রকাশ করলেন। হযরত ইছা (আঃ) ধৃত হলেন এবং রাজবিচারে তিনি মৃত্যুদণ্ড লাভ করলেন। সে সময়ের মৃত্যুদণ্ডে এখনকার মত গলায় ফাঁসী দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। ছলীবের সাহায্যে তখন মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতো।
ছলীবের আকৃতি হলো এই – একটি লম্বা কাঠের উপরের অংশে আর একখানি কাঠ আড়াআড়িভবে জুড়ে দেয়া হতো। তাতে অপরাধীকে এমনিভাবে ঝুলিয়ে দেয়া হতো যে, অপরাধীর পৃষ্ঠদেশ কাষ্ঠদ্বয়ের সংযুক্তি স্থলের উপর রক্ষিত হতো। আড়া কাঠের উভয় দিকে দুই হাত বিস্তারিত করে দিয়ে তাতে পেরেক মেরে দেয়া হতো। কারো হাটুতে ও পেরেক ফুড়ে কাঠ-সলগ্ন করে দেয়া হতো। এই অবস্থায় ঝুলে থেকে ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও যন্ত্রণায় ছটফট করে মরে যেত। হযরত ইছা (আঃ) –কে ও ছলীবে বিদ্ধ করে রাখা হলো। পরদিন ইয়াহুদীদের উৎসবের দিনে কোনো অপরাধীর ছলীবে ঝুলন্ত থাকা তাদের ধর্মমতে বিধেয় ছিল না। হযরত ইছা (আঃ)-কে দুপুরের দিকে ক্রুশে বিদ্ধ করা হয়েছিল। পায়ে কাটা বিদ্ধ করা হচ্ছিল না। তবুও তিনি সেই যাতনায়ই মুষড়িয়ে পড়লেন এবং চেতনা হারালেন; তিনি শরীরের দিক দিয়েও কৃশকায় ছিলেন। ঈদের দিনের কারণে যখন সন্ধ্যার দিকে তাঁকে ক্রুশ থেকে খসান হলো, তখন তাঁকে মৃত বলেই ধারণা করা হলো। তাঁকে গোরস্থানে পাঠিয়ে দেয়া হলো এবং দাফন করা হলো। কোন সহৃদয় ব্যক্তি তাঁকে কবর থেকে উঠিয়ে এনেছিলেন। পরে তিনি চেতনা লাভ করলেন। অতঃপর তিনি নিরুদ্দেশ হন। তিনি কোথায় কিভাবে আত্মগোপন করেন তার সঠিক তত্ত্ব জানা যায়নি। কোরআন শরীফে তাঁর সম্পর্কে বর্ণিত রয়েছে যে, তাঁকে হত্যা করা হয়নি। তিনি ক্রুশে প্রাণ দান করেন নি। বরং মৃত্যুর মতোই ধারণা করা হয়েছিল, পরে আল্লাহ তাঁকে পৃথিবী থেকে তুলে নিলেন। এর ৫ শত বৎসর পরে হযরত মোহাম্মদ মোস্তাফা (দঃ) এই পৃথিবীতে সংবাদ দিয়েছেন।


বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)
(৫৭০-৬৩২ খ্রীঃ)

যে মহামানবের সৃস্টি না হলে এ ধরা পৃষ্ঠের কোন কিছুই সৃষ্টি হতো না, যার পদচারণ লাখ পৃথিবী ধন্য হয়েছে; আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভালবাসা, অন্তেরর পবিত্রতা, আত্মার মহত্ত্ব, ধৈর্য্য, ক্ষমা, সততা, নম্রতা, বদান্যতা, মিতাচার, আমানতদারী, সুরুচি।
পূর্ণ মনোভাব, ন্যায়পরায়ণতা, উদারতা ও কঠোর কর্তব্যনিষ্ঠা ছিল যার চরিত্রের ভূষণ; যিনি ছিলেন একাধারে ইয়াতীম হিসেবে সবার স্নেহের পাত্র, স্বামী হিসেবে প্রেমময়, পিতা হিসেবে স্নেহের আধার, সঙ্গী হিসেবে বিশ্বস্ত; যিনি ছিলেন সফল ব্যবসায়ী, দূরদর্শী সংস্কারক, ন্যায় বিচারক, মহৎ রাজনীতিবিদ এবং সফল রাষ্ট্রনায়ক; তিনি হলেন সর্বকালের সর্বযুগের এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)। তিনি এমন এক সময় পৃথিবীর বুকে আবির্ভূত হয়েছিলেন যখন আরবের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থা অধ:পতনের চরম সীমায় নেমে গিয়েছিল।
৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট মোতাবেক ১২ রবিউল আউয়াল রোজ সোমবার প্রত্যুষে আরবের মক্কা নগরীতে সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে মাতা আমেনার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জন্মের ৫ মাস পূর্বে পিতা আব্দুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। আরবের তৎকালীন অভিজাত পরিবারের প্রথানুযায়ী তাঁর লালনপালন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব অর্পিত হয় বনী সা’দ গোত্রের বিবি হালিমার উপর। এ সময় বিবি হালিমার আরেক পুত্র সন্তান ছিল, যার দুধ পানের মুদ্দত তখনো শেষ হয়নি। বিবি হালিমা বর্ণনা করেন,” শিশু মুহাম্মদ কেবলমাত্র আমার ডান স্তনের দুধ পান করত। আমি তাকে আমার বাম স্তনের দুধ দান করতে চাইলেও, তিনি কখনো বাম স্তন হতে দুধ পান করতেন না। আমার বাম স্তনের দুধ তিনি তার অপর দুধ ভাইয়ের জন্যে রেখে দিতেন। দুধ পানের শেষ দিবস পর্যন্ত তার এ নিয়ম বিদ্যমান ছিল।“ ইনসাফ ও সাম্যের মহান আদর্শ তিনি শিশুকালেই দেখিয়ে দিয়েছেন। মাত্র ৫ বছর তিনি ধাত্রী মা হালিমার তত্ত্বাবধানে ছিলেন। এরপর ফিরে আসেন মাতা আমেনার গৃহে। ৬ বছর বয়সে তিনি মাতা আমেনার সাথে পিতার কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে মদীনা যান এর্ব মদীনা হতে প্রত্যাবর্তনকালে ‘আবহাওয়া’ নামক স্থানে মাতা আমেনা ইন্তেকাল করেন। এরপর ইয়াতীম মুহাম্মদ (সা:) এর লালন পালনের দায়িত্ব অর্পিত হয় ক্রমান্বয়ে দাদা আব্দুল মোতালিব ও চাচা আবু তালিবের উপর। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ যে মহামানব আবির্ভূত হয়েছেন সারা জাহানের রহমত হিসেবে; তিনি হলেন আজন্ম ইয়াতীম এবং দুঃখ বেদনার মধ্য দিয়েই তিনি গড়ে উঠেন সত্যবাদী, পরোপকারী এবং আমানতদারী হিসেবে। তার চরিত্র, আমানতদারী ও সত্যবাদিতার জন্যে আরেবের কাফেররা তাকে, ‘আল্ আমীন’ অর্থাৎ ‘বিশ্বাসী’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল। তৎকালীন আরবে অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা, হত্যা, যুদ্ধবিগ্রহ ইত্যাদি ছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার। ‌ ‘হরবে ফুজ্জার’ এর নৃশংসতা বিভীষিকা ও তান্ডবলীলা দেখে বালক মুহাম্মদ (সা:) দারুণভাবে ব্যথিত হন এবং ৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ১৪ বছর বয়সে চাচা হযরত যুবায়ের (রা:) ও কয়েকজন যুবককে সাথে নিয়ে অসহায় ও দুর্গত মানুষদের সাহায্যার্থে এবং বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে শান্তি, শৃঙ্খলা ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠার দীপ্ত অংগীকার নিয়ে গড়ে তোলেন ‘হিলফুল ফুজুল’ নামক একটি সমাজ সেবামূলক সংগঠন। বালক মুহাম্মদ (সা:) ভবিষ্যতে যে শান্তি স্থাপনের অগ্রদূত হবেন এখানেই তার প্রমাণ মেলে।
যুবক মুহাম্মদ (সা:) এর সততা, বিশ্বস্ততা, চিন্তা চেতনা, কর্ম দক্ষতা ও ন্যায় পরায়ণতায় মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন আরবের ধনাঢ্য ও বিধবা মহিলা বিবি খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ বিবাহের প্রস্তাব দেন। এ সময় বিবি খাদিজার বয়স ছিল ৪০ বছর এবং মুহাম্মদ (সা:) এর বয়স ছিল ২৫ বছর। তিনি চাচা আবু তালিবের সম্মতিক্রমে বিবি খাদিজার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। বিবাহের পর বিবি খাদিজা তাঁর ধন-সম্পদ মুহাম্মদ (সা:) এর হাতে তুলে দেন। কিন্তু তৎকালীন আরবের কাফের, মুশরিক, ইুহুদি, নাসারা ও অন্যান্য ধর্ম মতাবলম্বীদের অন্যায়, জুলুম, অবিচার, মিথ্যা ও পাপাচার দেখে মুহাম্মদ (সা:) এর হৃদয় দু:খ বেদনায় ভরে যেত এবং পৃথিবীতে কিভাবে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায়, সে চিন্তায় তিনি প্রায়ই মক্কার অনতিদূরে ‘হিরা’ নামক পর্বতের গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকতেন। বিবি খাদিজা স্বামীর মহৎ প্রতিভা ও মহান ব্যক্তিত্ব উপলব্ধি করতে পেরে মুহাম্মদ (সা:) কে নিশ্চিত মনে অবসর সময় ‘হেরা’ পর্বতের গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকার পূর্ণ সুযোগ দিয়েছিলেন। ক্রমান্বয়ে তাঁর বয়স যখন ৪০ বছর পূর্ণ হয় তখন তিনি নবুয়্যত লাভ করেন এবং তাঁর উপর সর্ব প্রথম নাজিল হয় পবিত্র কোরআনের সূরা-আলাকের প্রথম কয়েকটি আয়াত। এরপর সুদীর্ঘ ২৩ বছরে বিভিন্ন ঘটনা ও প্রয়োজন অনুসারে তাঁর উপর পূর্ণ ৩০ পারা কোরআন শরীফ নাজিল হয়।
নবুয়্যত প্রাপ্তির পর প্রথম প্রায় ৩ বছর তিনি গোপনে স্বীয় পরিবার ও আত্মীয়ের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত প্রচার করেন। সর্ব প্রথম ইসলাম কবুল করেন বিবি খাদিজা (রা:)। এরপর যখন তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার শুরু করেন এবং ঘোষণা করেন, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসূলল্লাহ’ তখন মক্কার কুরাইশ কাফেররা তাঁর বিরোধিতা করতে শুরু করে। এতদিন বিশ্বনবী (সা:) কুরাইশদের নিকট ছিলেন ‘আল্ আমীন’ হিসেবে পরিচিত; ক্ন্তিু এ ঘোষণা দেয়ার পর তিনি হলেন কুরাইশ কাফেরদের ভাষায় একজন জাদুকর ও পাগল। যেহেতু কোরআন আরবী ভাষায় নাজিল হয়েছে এবং আরববাসীদের ভাষাও ছিল আরবী, তাই তারা মুহাম্মদ (সা:) এর বাণীর মর্মার্থ অনুধাবন করতে পেরেছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, মুহাম্মদ (সা:) যা প্রচার করছেন তা কোন সাধারণ কথা নয়। যদি এটা মেনে নেয়া হয় তাহলে তাদের ক্ষমতার মসনদ টিকে থাকবে না। তাই তারা মুহাম্মদ (সা:) কে বিভিন্ন ভয়, ভীতি, হুমকি; এমনকি ধন-দৌলত ও আরবের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী যুবতী নারীদের দেবার লোভ দেখাতে শুরু করে। মুহাম্মদ (সা:) কাফিরদের শত ষড়যন্ত্র ও ভয়-ভীতির মধ্যে ঘোষণা করলেন, “আমার ডান হাতে যদি সূর্য আর বাম হাতে চাঁদ দেয়া হয়, তবু আমি সত্য প্রচার থেকে বিরত থাকব না।‍” কাফিরদের কোন লোভ লালসা বিশ্বনবী (সা:) কে ইসলাম প্রচার থেকে বিন্দুমাত্র বিরত রাখতে পারেনি। মক্কায় যারা পৌত্তলিকতা তথা মূর্তি পূজা ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করেছিল কুরাইশরা তাঁদের উপর অবর্ণনীয় নির্যাতন শুরু করে। কিন্তু ইসলামরে শাশ্বত বাণী যারা একবার গ্রহণ করেছে তাঁদের কে শত নির্যাতন করেও ইসলাম থেকে পৌত্তলিকতায় ফিরিয়ে নিতে পারেনি।
৬২০ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ (সা:) এর জীবন সঙ্গিনী বিবি খাদিজা (রা:) এবং পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চাচা আবু তালিব ইন্তেকাল করেন। জীবনের এ সংকটময় মুহূর্তে তাঁদেরকে হারিয়ে বিশ্বনবী (সা:) শোকে দুঃখে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। বিবি খাদিজা ছিলেন বিশ্বনবীর দুসময়ের স্ত্রী, উপদেষ্টা এবং বিপদ আপদে সান্ত্বনা স্বরুপ। চাচা আবু তালিব ছিলেন শৈশবের অবলম্বন, যৌবনের অভিভাবক এবং পরবর্তী নবুয়্যত জীবনের একনিষ্ঠ সমর্থক। ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি স্বীয় পালিত পুত্র হযরত যায়েদ বিন হারেসকে সংগে নিয়ে তায়েফ গমন করলে সেখানে ও তিনি তায়েফবাসীদের কর্তৃক নির্যাতিত হন। তায়েফবাসীরা প্রস্তরাঘাতে বিশ্বনবীকে জর্জরিত করে ফেলে।
অবশেষে ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ২ জুলাই (নবুয়্যতের ত্রয়োদশ বছর) ইতিমধ্যে মদীনায় ইসলামী আন্দোলনের একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। মদীনাবাসীগণ মুহাম্মদ (সা:) এর কার্যপদ্ধতিতে এক বিরাট পরিবর্তন এনে দেয়। এতদিন মক্কায় ইসলাম ছিল কেবকলমাত্র একটি ধর্মের নাম; কিন্তু মদীনায় এসে তিনি দৃঢ় ভিত্তির উপর ইসলামী রাষ্ট্র গঠনে আত্মনিয়োগ করেন।এতদুদ্দেশ্যে তিনি সেখানে চিরাচরিত গোত্রীয় পার্থক্য তুলে দেন। সে সময় মদীনায় পৌত্তলিক ও ইহুদিরা বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল। মুহাম্মদ (সা:) মনে প্রাণে অনুভব করতে পেরেছিলেন যে, যেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায় এর লোকের বাস সেখানে সকল সম্প্রদায়ের সমর্থন সহযোগিতা না পলে ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই তিনি সেখানে সকল সম্প্রদায়ের লোকদের নিয়ে একটি সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। এবং সেখানে একটি আন্তর্জাতিক সনদপত্র ও সাক্ষরিত হয়, যা ইসলামের ইতিহাসে, ‘মদীনার সনদ’ নামে পরিচিত। পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র বা সংবিধান। উক্ত সংবিধানে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার, জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করা হয়। মুহাম্মদ (সা:) হন ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সভাপতি। তিনি যে একজন দূরদর্শি ও সফল রাজনীতিবদি এখানেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। মদীনার সনদ নাগরিক জীবনে আমূল পরিবর্তন আনে এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্থাপিত হয় ঐক্য। বিশ্বনবী (সা:) তলোয়রের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেননি বরং উদারতার মাধ্যমেই ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর ও নবদিক্ষিত মুসলমানগণের (সাহাবায়ে কেরাম) চালচলন, কথাবর্তা, সততা ও উদারতায় মুগ্ধ হয়ে যখন দলে দলে লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করতে লাগল তখন কুরাইশ নেতাদের মনে হিংসা ও শত্রুতার উদ্রেক হয়। অপরদিকে মদীনার কতিপয় বিশ্বাসঘাতক মুহাম্মদ (সা:) এর প্রাধান্য সহ্য করতে না পেরে গোপনভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে। কাফিরদের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করার জন্যেই মুহাম্মদ (সা:) তলোয়ার ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফলে ঐতিহাসিক বদর, উহুদ ও খন্দক সহ অনেকগুলো যুদ্ধ সংগঠিত হয় এবং সকল যুদ্ধের প্রায় সবগুলোতেই মুসলমানগণ জয়লাভ করেন। বিশ্বনবী (সা:) মোট ২৭টি যুদ্ধে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
৬২৭ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ষষ্ঠ হিজরীতে ১৪০০ নিরস্ত্র সাহাবীকে সঙ্গে নিয়ে মুহাম্মদ (সা:) মাতৃভূমি দর্শন ও পবিত্র হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা রওনা দেন। কিন্তু পথিমধ্যে কুরাইশ বাহিনী কর্তৃক বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যা ইসলামের ইতিহাসে ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ নামে পরিচিত। সন্ধির শর্তাবলীর মধ্যে এ কথাগুলো উল্লেখ ছিল যে-(১) মুসলমানগণ এ বছর ওমরা আদায় না করে ফিরে যাবে, (২) আগামী বছর হজ্জে আগমন করবে, তবে ৩ দিনের বেশি মক্কায় অবস্থান করতে পারবে না, (৩) যদি কোন কাফির স্বীয় অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত মুসলমান হয়ে মদীনায় গমন করে তাহলে তাকে মক্কায় ফিরিয়ে দিতে হবে। পক্ষান্তরে মদীনা হতে যদি কোন ব্যক্তি পলায়ন পূর্বক মক্কায় চলে আসে তাহলে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হবে না, (৪) প্রথম থেকে যে সকল মুসলমান মক্কায় বসবাস করছে তাদের কাউকে সাথে করে মদীনায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। আর মুসলমানগণের মধ্যে যারা মক্কায় থাকতে চায় তাদেরকে বিরত রাখা যাবে না, (৫) আরবের বিভিন্ন গোত্রগুলোর এ স্বাধীনতা থকবে যে, তার উভয় পক্ষের (মুসলিম ও কাফির) মাঝে যাদের সঙ্গে ইচ্ছে সংযোগ স্থাপন করতে পারবে, (৬) সন্ধিচুক্তির মেয়াদের মধ্যে উভয় পক্ষ শান্তি নিরাপত্তার সাথে যাতায়াতের সম্পর্ক চালূ রাখতে পারবে। এছাড়া কুরাইশ প্রতিনিধি সুহায়েল বিন আমর সন্ধিপত্র থেকে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ এবং ‘মুহাম্মদুর রাসুলল্লাহ’ বাক্য দু’টি কেটে দেয়ার জন্যে দাবি করেছিল। কিন্তু সন্ধি পত্রের লেখক হযরত আলী (রা:) তা মেনে নেতে রাজি হলেন না। অবশেষ বিশ্বনবী (সা:) সুহায়েল বিন আমরের আপত্তির প্রেক্ষিতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ এবং ‘মুহাম্মদুর রাসুলল্লাহ’ বাক্য দু’টি নিজ হাতে কেটে দেন এবং এর পরিবর্তে সুহায়েল বিন আমরের দাবি অনুযায়ী ‘বিছমিকা আল্লাহুমা’ কে নির্দেশ দেন। সুতরাং বাহ্যিক দৃষ্টিতে এ সন্ধি মুসলমানদের জন্যে অপমানজনক হলেও তা মুহাম্মদ (সা:) এর রাজনৈতিক সত্তাকে একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে স্বীকার করে নেয়। সন্ধির শর্তানুযায়ী অমুসলিমগণ মুসলমানদের সাথে অবাধে মেলামেশার সুযোগ পায়। ফলে অমুসলিমগণ ইসলামের মহৎ বাণী উপলব্ধি করতে থাকে এবং দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। এ সন্ধির পরই মুহাম্মদ (সা:) বিভিন্ন রাজন্যবর্গের নিকট ইসলামের দাওয়াত দিয়ে পত্র প্রেরণ করেন এবং অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করেন। মুহাম্মদ (সা:) যেখানে মাত্র ১৪০০ মুসলিম সৈন্য নিয়ে হুদায়বিয়াতে গিয়েছিলেন, সেখানে মাত্র ২ বছর অর্থাৎ অষ্টম হিজরীতে ১০,০০০ মুসলিম সৈন্য নিয়ে বিনা রক্তপাতে মক্কা জয় করেন। যে মক্কা থেকে বিশ্বনবী (সা:) নির্যাতিত অবস্থায় বিতাড়িত হয়েছিলেন, সেখানে আজ তিনি বিজয়ীর বেশে উপস্থিত হলেন এবং মক্কাবাসীদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। মক্কা বিজয়ের দিন হযরত ওমর ফারুক (রা:) কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানকে গ্রেফতার করে মুহাম্মদ (সা:) এর সম্মুখে উপস্থিত করেন। কিন্তু তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের শত্রুকে হাতে পেয়েও ক্ষমা করে দেন। ক্ষমার এ মহান আদর্শ পৃথিবীর ইতিহাসে আজ
ও বিরল। মক্কায় আজ ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডিয়মান। সকল অন্যায় অসত্য, শোষণ ও জুলুমের রাজত্ব চিরতরে বিলুপ্ত।
৬১৩ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক দশম হিজরীতে মুহাম্মদ (সা:) লক্ষাধিক মুসলিম সৈন্য নিয়ে বিদায় হজ্জ সম্পাদন করেন এবং হজ্জ শেষে আরাফাতের ময়দানে প্রায় ১,১৪,০০০ সাহাবীর সম্মুখে জীবনের অন্তিম ভাষণ প্রদান করেন যা ইসলামের ইতহাসে “বিদায় হজ্জের ভাষণ” নামে পরিচিত। বিদায় হজ্জের ভাষণে বিশ্বনবী (সা:) মানবাধিকার সম্পর্কিত যে সনদপত্র ঘোষণা করেন দুনিয়ার ইতিহাসে তা আজও অতুলনীয়। তিনি দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, (১) হে বন্ধুগণ, স্মরণ রেখ, আজিকার এ দিন, এ মাস এবং এ পবিত্র নগরী তোমাদের নিকট যেমন পবিত্র, তেমনি পবিত্র তোমাদের সকলের জীবন, তোমাদের ধন-সম্পদ, রক্ত এবং তোমাদের মান-মর্যাদা তোমাদের পরস্পরের নিকট। কখনো অন্যর উপর অন্যায় ভাবে হস্তক্ষেপ করবে না। (২) মনে রেখ, স্ত্রীদের উপর তোমাদের যেমন অধিকার আছে, তোমাদের উপর ও স্ত্রীদের তেমন অধিকার আছে। (৩) সাবধান, শ্রমিকর মাথার ঘাম শুকাবার পূর্বেই তার উপযুক্ত পারিশ্রমিক পরিশোধ করে দিবে। (৪) মনে রেখ, যে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্থ থাকে সে প্রকৃত মুসলমান হতে পারে না। (৫) চাকর চাকরাণীদের প্রতি নিষ্ঠুর হইও না। তোমরা যা খাবে, তাদেরকে তাই খেতে দিবে; তোমরা যা পরিধান করবে, তাদেরকে তাই (সমমূল্যের)পরিধান করতে দিবে। (৬) কোন অবস্থাতেই ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করবে না। এমনি ভাবে মানবাধিকার সম্পর্কিত বহু বাণী তিনি বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে পেশ করে যান। তিনি হলেন উত্তম চরিত্রের অধিকারী, মানবজাতির একমাত্র আদর্শ এবং বিশ্ব জাহানের রহমত হিসেবে প্রেরিত।
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) তাঁর নবুয়্যতের ২৩ বছরের আন্দোলনে আরবের একটি অসভ্য ও বর্বর জাতিকে একটি সভ্য ও সুশৃঙ্খল জাতিতে পরিণত করেছিলেন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে আমূল সংস্কার সাধিত হয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চিরাচরিত গোত্রীয় পার্থক্য তুলে দিয়ে, তিনি ঘোষণা করেন, ‘অনারবের উপর আরবের এবং আরবের উপর অনারবে; কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের এবং শ্বেতাঙ্গের উপর কৃষ্ণাঙ্গের কোন পার্থক্য নেই। বরং তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে অধিক মুত্তাকিন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি সুদকে সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং যাকাত ভিত্তিক অর্থনীতির মাধ্যমে এমন একটি অর্থ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক তাদের আর্থিক নিরাপত্তা লাভ করেছিল। সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর কোন মর্যাদা ও অধিকার ছিল না। বিশ্বনবী (সা:) নারী জাতিকে সর্ব্বোচ্চ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করলেন এবং ঘোষণা করলেন “মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।“ নারী জাতিকে শুধু মাতৃত্বের মর্যাদাই দেননি, উত্তরাধিকার ক্ষেত্রেও তাদের অধিকারকে করেছেন সমুন্নত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। ক্রীতদাস আযাদ করাকে তিনি উত্তম ইবাদত বলে ঘোষণা করেন। ধর্মীয় ক্ষেত্রে যেখানে মূর্তিপূজা, অগ্নিপূজা এবং বিভিন্ন বস্তুর পূজা আরববাসীদের জীবনকে কলুষিত করেছিল সেখানে তিনি আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করেন। মুদ্দা কথা তিনি এমন একটি অপরাধমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেখানে কোন হানাহানি, রাহাজানি, বিশৃঙ্খলা, শোষণ, জুলুম, অবিচার, ব্যভিচার, সুদ, ঘুষ ইত্যাদি ছিল না।
অবশেষে এ মহামানব ১২ রবিউল আউয়াল, ১১ হিজরী মোতাবেক ৭ জুন, ৬৩২ খ্রিঃ ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি হলেন সর্বশেষ নবী ও রাসূল। পৃথিবীর বুকে কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নবীর আবির্ভাব হবে না। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) গোটা মুসলিম জাতিকে উদ্দেশ্য করে বলে গিয়েছেন, “আমি তোমাদের জন্যে দু’টি জিনিস রেখে গেলাম। যতদিন তোমরা এ দু’টি জিনিসকে আকঁড়ে রাখবে ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। একটি হল আল্লাহর কিতাব অর্থাৎ কোরআন আর একটি হল আমার সুন্নাহ অর্থাৎ হাদিস। বিশ্বনবী (সাঃ) এর জীবনী লিখতে গিয়ে খ্রিস্টান লেখক ঐতিহাসিক উইলিয়াম মূর বলেছেন, “He Was the mater mind not only of his own age but of all ages ”অর্থাৎ মুহাম্মদ (সা:) যে যুগে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন তাকে শুধু সে যুগেরই একজন মনীষী বলা হবে না, বরং তিনি ছিলেন সর্বকালের, সর্বযুগের, সর্বশ্রেষ্ঠ মনীষী।
শুধু ঐতিহাসিক উইলিয়াম মূরই নন, পৃথিবীর বুকে যত মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে প্রায় প্রত্যেকেই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) সম্পর্কে তাঁদের মূল্যবান বাণী পৃথিবীর বুকে রেখে গেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “ তোমাদের জন্যে আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (সূরা-আহযাব, আয়াত ২১)
বর্তমান অশান্ত, বিশৃঙ্খল ও দ্বন্দ মুখর আধুনিক বিশ্বে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর আদর্শকে অনুসরণ করা হলে বিশ্বে শান্তি ও একটি অপরাধমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা নিঃসন্দেহে সম্ভব।


Most of the web pages you encounter is presented to you via HTML,the world wide web’s
markup language. In this article, I will share with you 20 best practices that will lead to clean and
correct markup.
1. Always Declare a Doctype
The doctype declaration should be the first thing in your HTML documents. The doctype
declaration tells the browser about the XHTML standards you will be using and helps it
read and render your markup correctly. I would recommend using the XHTML 1.0 strict doctype.
Some developers consider it a tough choice because this particular standard is less forgiving
than loose or transitional doctype declarations, but it also ensures that your code abides strictly
by the latest standards

<!DOCTYPE html PUBLIC "-//W3C//DTD XHTML 1.0 Strict//EN" "http://www.w3.
org/TR/xhtml1/DTD/xhtml1-strict.dtd">
2. Use Meaningful Title Tags
The <title> tag helps make a web page more meaningful and search-engine friendly. For example,
the text inside the <title> tag appears in Google’s search engine results page, as well as in the
user’s web browser bar and tabs. Take for instance, the following example:
<title>Six Revisions - Web Development and Design Information</title>
The example above appears like the following image in Google’s search engine results page:

3. Use Descriptive Meta Tags

Meta tags make your web page more meaningful for user agents like search engine spiders.

Description of Meta Attribute

The description meta attribute describes the basic purpose of your web page (a summary of what
the web page contains). For each web page, you should place a consise and relevant summary
inside the meta description tag. For example, this description:
<meta name="description" content="Six Revisions is a blog that shares useful information about
web development and design, dedicated to people who build websites." /> Shows up in Google’s
search engine results page as follows:

Don’t try to spam your description with repeated words and phrases because search engines are
intelligent enough to detect that. Instead, just try to be simple and straightforward in explaining the
purpose of your web page.

Keywords Meta Attribute

<meta name="keywords" content="web design, web development" />
The keywords meta attribute contains a comma-separated list of key words and phrases that relate
to your web page. These keywords make your web page even more meaningful. Again, just like
with the description meta attribute, avoid repetition of words and phrases; just mention a few words
that aptly describes and categorizes your web page.

4. Use Divs to Divide Your Layout into Major Sections
Consider dividing your web page into major sections as the first step in constructing a website
design.

Doing so from the start promotes clean and well-indented code. It will also help you avoid confusion
and excess use of divs, especially if you are writing complex and lengthy markup.

5. Separate Content from Presentation

Your HTML is your content. CSS provides your content’s visual presentation. Never mix both. Don’t
use inline styles in your HTML. Always create a separate CSS file for your styles. This will help you
and future developers that might work on your code make changes to the design quicker and make
your content more easily digestible for user agents.

Bad Practice: Inline Styles

Below, you can see a paragraph element that is styled using the style attribute. It will work,
but it’s bad practice.
<p style="color:#abc; font-size:14px; font-family:arial,sans-serif;">
I hate to separate my content from presentation</p>

6. Minify and Unify CSS

A simple website usually has one main CSS file and possibly a few more for things like CSS reset
and browser-specific fixes. But each CSS file has to make an HTTP request, which slows down
website load times. A solution to this problem is to minify (take out unneeded characters such as
spaces, newlines, and tabs) all your code and try to unify files that can be combined into one file.
This will improve your website load times. A problem with this approach is that you have to
"unminiy" (because it’s hard to read unformatted code) and then redo the minification process
every time you need to update your code. So it’s better to do this at the end of your production cycle.
Online tools to minify and optimize CSS can be found on this list of CSS optimizers. Also, always
put your stylesheet reference link inside the <head></head> tags because it will help your web
page feel more responsive while loading.

7. Minify, Unify and Move Down JavaScript

Like CSS, never use inline JavaScript and try to minify and unify your JavaScript libraries to reduce
the number of HTTP requests that need to be made in order to generate one of your web pages.
But unlike CSS, there is one really bad thing about external JavaScript files: browsers do not allow
parallel downloads, which means the browser cannot download anything while it’s downloading
JavaScript, resulting in making the page feel like it’s loading slowly. So, the best strategy here is
to load JavaScript last (i.e. after your CSS is loaded). To do this, place JavaScript at the bottom
of your HTML document where possible. Best practice recommends doing this right before the
closing <body>tag.

Example

8. Use Heading Elements Wisely

Learn to use <h1> to <h6> elements to denote your HTML’s content hierarchy. This helps make
your content more meaningful for screen-reading software and search engines, as well as other
user agents.

Example

<h1>This is the topmost heading</h1>
<h2>This is a sub-heading underneath the topmost heading.</h2>
<h3>This is a sub-heading underneath the h2 heading.</h3>
For blogs, I really recommend using the <h1> element for the blog post’s title instead of the
site’s name because this is the most important thing for search engines.

WordPress Code Example

<h1 class="entry-title"><?php the_title(); ?></h1>

9.Use the Right HTML Element at the Right Place

Learn about all the available HTML elements and use them correctly for a semantic and
meaningful content structure.
Use <em> for emphasis and <strong> for heavy emphasis, instead of <i> or <b>
(which are deprecated).

Example

<em>emphasized text</em>
<strong>strongly emphasized text</strong>
Use <p> for paragraphs. Don’t use <br /> to add a new line between paragraphs;
use CSS margin
and/or padding properties instead.
For a set of related elements, use:
  • <ul> (unordered lists) when the order of the list items are not important

  • <ol> (ordered lists) when the order of the list items are important

  • <dl> (definition lists) for item/definition pairs

Don’t use <blockquote> for indentation purposes; use it when actually quoting text.

10. Don’t Use Divs for Everything

Sometimes developers end up wrapping <div> tags around multiple <div> tags that contain more
<div> tags, creating a mountain of divs. Under the latest draft of the W3C HTML specification, a
<div> is a meaningless element that should be used "as an element of last resort, for when no other
element is suitable." But many use it even for menial things like displaying inline elements as block
elements (instead of the display:block;CSS property). Avoid creating mountains of divs by using
them sparingly and responsibly.

11. Use an Unordered List (<ul>) for Navigation

Navigation is a very important aspect of a website design and the <ul> element combined with
CSS makes your navigation menus semantic (because, after all, a navigation menu is a list of links)
as well as beautiful. Also, by convention, an unordered list for your navigation menu has been
the accepted markup.

An Example of an Unordered List

<ul id="main_nav">
<li><a href="#" class="active">Home</a></li>
<li><a href="#">About</a></li>
<li><a href="#">Portfolio</a></li>
<li><a href="#">Services</a></li>
<li><a href="#">Blog</a></li>
<li><a href="#">Contact Us</a></li>
</ul>

CSS to Style the Unordered List into a Horizontal Navigation Bar

#main_nav { position:absolute; right:30px; top:40px;}
#main_nav li { float:left; margin-left:2px; }
#main_nav li a{ font-size:16px; color:#fff; text-decoration:
none; padding:8px 15px; -moz-border-radius:7px; -webkit-border- radius:
px; border-radius:7px;}
#main_nav li a.active,
#main_nav li a:hover{  background-color:#0b86cb;  }

Output

Use an Unordered List (<ul>) for Navigation

12. Close Your Tags

Closing all your tags is a W3C specification. Some browsers may still render your pages correctly
(under Quirks mode), but not closing your tags is invalid under standards.

Example

<div id="test">
<img src="images/sample.jpg" alt="sample" />
<a href="#" title="test">test</a>
<p>some sample text </p>
</div>

13. Use Lower Case Markup

It is an industry-standard practice to keep your markup lower-cased. Capitalizing your markup will
work and will probably not affect how your web pages are rendered, but it does affect code
readability.

Bad Practice

<DIV>
<IMG SRC="images/sample.jpg" alt="sample"/>
<A HREF="#" TITLE="TEST">test</A>
<P>some sample text</P>
</DIV>

Good Practice

<div id="test">
<img src="images/sample.jpg" alt="sample" />
<a href="#" title="test">test</a>
<p>some sample text </p>
</div>

14. Use Alt Attributes with Images

Using a meaningful alt attribute with <img> elements is a must for writing valid and semantic code.

Bad Practice

<img id="logo" src="images/bgr_logo.png"/>
<!-- has an alt attribute, which will validate, but alt value is meaningless -->
<img id="logo" src="images/bgr_logo.png" alt="brg_logo.png" />

Good Practice

<img id="logo" src="images/bgr_logo.png" alt="Six Revisions Logo" />

15.Use Title Attributes with Links (When Needed)

Using a title attribute in your anchor elements will improve accessibility when used the right way.
It is important to understand that the title attribute should be used to increase the meaning of the
anchor
tag.

Bad Practice

<!-- Redundant title attribute -->
<a href="http://blog.com/all-articles" title="Click Here">Click here.</a>
When a screen reader reads the anchor tag, the listener has to listen to the same text twice.
What’s worse is that it doesn’t explain what the page being linked to is. If you are just repeating
the anchor’s text or aren’t intending to describe the page being linked, it’s better not to use a
title at all.

Good Practice

<a href="http://blog.com/all-articles" title="A list of all articles.">Click here.
</a>

16. Use Fieldset and Labels in Web Forms

Use the <label> element to label input fields. Divide input fields into logical sets using <fieldset>
Name a <fieldset>using <legend>. All of this will make your forms more understandable for users
and improve the quality of your code.

Example

<fieldset>
<legend>Personal Details</legend>
<label for="name">name</label><input type="text" id="name" name=
"name" />
<label for="email">email</label><input type="text" id="email" name=
"email" />
<label for="subject">subject</label><input type="text" id="subject"
name="subject" />
<label for="message" >message</label><textarea rows="10" cols="20"
id="message" name="message" ></textarea>
</fieldset>

17.Use Modular IE Fixes

You can use conditional comments to target Internet Explorer if you are having issues
with your web pages.

IE 7 Example

<!--[if IE 7]>
<link rel="stylesheet" href="css/ie-7.css" media="all">
<![endif]-->

IE 6 Example

<!--[if IE 6]>
<link rel="stylesheet" href="css/ie-6.css" media="all">
<script type="text/javascript" src="js/DD_belatedPNG_0.0.8a-min.js">
</script>
<script type="text/javascript">
 DD_belatedPNG.fix('#logo');
 </script>
<![endif]-->
However, try to make your fixes modular to future-proof your work such that when older versions of
IE don’t need to be supported anymore, you just have to update your site in one place (i.e. take out
the reference to the ie6.css stylesheet). By the way, for pixing PNG transparencies in IE6, I
recommend the DD_belated PNG script (the JavaScript method referenced above).

18.Validate Your Code

Validation should not be the end-all evaluation of good work versus bad work. Just because your
work validates doesn’t automatically mean it’s good code; and conversely, a work that doesn’t fully
validate doesn’t mean it’s bad (if you don’t believe me, try auto-validating Google or Yahoo!). But
auto-validation services such as the free W3C markup validation service can be a useful debugger
that helps you identify rendering errors. While writing HTML, make a habit to validate frequently;
this will save you from issues that are harder to pinpoint (or redo) once your work is completed
and lengthier.

19. Write Consistently Formatted Code
A cleanly written and well-indented code base shows your professionalism, as well as your
consideration for the other people that might need to work on your code. Write properly indented
clean markup from the start; it will increase your work’s readability.

20. Avoid Excessive Comments


While documenting your code, the purpose is to make it easier to understand, so commenting your
code logic is a good thing for programming languages like PHP, Java and C#. But markup is very
much self-explanatory and commenting every line of code does not make sense in HTML/XHTML.

MKRdezign

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget